রাজনীতির লাইমলাইটে যেভাবে এসেছিলেন হাদি
চলে গেলেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ ওসমান হাদি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। ওসমান হাদির ভাই ওমর হাদি বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত ও সমালোচিত নামগুলোর একটি ছিলেন ওসমান হাদি। বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি যেমন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন, তেমনি নানা বিতর্কের মুখেও পড়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায় নিয়ে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমের আলোচনা-অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক–সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ গঠন করে তিনি রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান হন। একই সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে শুরু করেন প্রচার কার্যক্রম।
এরই মধ্যে এক প্রচারাভিযানের সময় বন্দুকধারীর গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কি এলাকার বক্স কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের এই নেতার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। তফসিল ঘোষণার পর এমন হামলা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
রাজনীতির কেন্দ্রে যেভাবে এলেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করা শরীফ ওসমান হাদি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি একটি ইংরেজি শিক্ষার কোচিংয়েও তিনি পাঠদান করতেন।
বরিশালের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি থেকে উঠে আসা হাদি শিক্ষাজীবন থেকেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ঝালকাঠির এন এস কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত থাকলেও তখন কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানই তাকে মূলত রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার বক্তব্য তাকে আলোচনায় রাখে। সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ এবং ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় সক্রিয় উপস্থিতিও তিনি দেখিয়েছিলেন।
ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, অপরাধীদের বিচার, আহত–নিহতদের স্বীকৃতি এবং ‘জুলাই চার্টার’ ঘোষণার দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেন হাদি। এসব উদ্যোগ তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য ঘোষণা করে ইনকিলাব মঞ্চ থেকে দেওয়া আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী বক্তব্যে তিনি একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরাগও বাড়ে।
হাদি একাধিকবার দাবি করেছিলেন, তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে তিনি জানান, দেশি–বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনা ও বিতর্ক
বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে যেমন প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি বিতর্কেও জড়িয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি। আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি তিনি বিএনপি নেতাদের বক্তব্যেরও প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে কর্মসূচি কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় সমর্থকদের মধ্যে মুড়ি–বাতাসা বিতরণের ছবি সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণার পর প্রচারণার ধরন, বক্তব্য এবং কৌশল নিয়েও সমালোচনা দেখা যায়।
ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, পল্টন, রমনা ও শাহজাহানপুর) থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি এলাকায় নিয়মিত প্রচার চালান। প্রচারণার নানা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে আলোচনায় থাকেন। এর মধ্যে প্রচারণার সময় একজন ব্যক্তির তার পকেটে টাকা দেওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়।
এছাড়া ভোররাতে মসজিদের সামনে লিফলেট বিতরণ, নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ, ডোনেশনের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ—এসব কার্যক্রমের ভিডিওও তিনি নিজেই সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতেন।
সব মিলিয়ে রাজনীতিতে ইতিবাচক আলোচনা যেমন তৈরি করেছিলেন, তেমনি নানা কারণে বিতর্কের মুখেও পড়েছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের এই নেতা।


No comments