Header Ads

এত ইলিশ একসাথে উধাও হলো কীভাবে?

                            

এত ইলিশ একসাথে উধাও হলো কীভাবে?



কক্সবাজার উপকূলে ইলিশ ধরা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন নিম্নচাপ সৃষ্টি, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং গভীর সমুদ্রে দেশি–বিদেশি ট্রলারের নির্বিচার মাছ শিকারের কারণে এই সংকট দেখা দিয়েছে। জেলেদের দাবি, ইলিশ না পাওয়ায় প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার এখন একবেলা খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছে।

খালি হাতে জেলেরা

বাঁকখালী নদীর ৬ নম্বর জেটিঘাটে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৭০০ মাছ ধরার ট্রলার। তবে ট্রলারগুলোতে নেই কোনো কর্মব্যস্ততা। জেলেরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। নুর হাসান, আবু তৈয়ুব মাঝি, মো. শফি ও আবদুল কাইয়ুম মাঝি—এঁরা চারজনই ৮ থেকে ১২ বছর ধরে সমুদ্রে ইলিশ ধরছেন। তাঁদের কথায়, “তিন বছর আগেও জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ত। তখন সংসার চলত ভালোভাবে, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও মেটানো যেত। এখন ইলিশ নেই, সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে গেছে।”

বাজারে আকাশছোঁয়া দাম

নুনিয়াছটা ফিশারি ঘাটে সকালে ভিড়েছিল মাত্র কয়েকটি ট্রলার। এর মধ্যে দুটি ট্রলারে ৭০ থেকে ১৩০টি ইলিশ পাওয়া গেছে। প্রতিটি মাছের ওজন ছিল ৮০০–৯০০ গ্রাম। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হয় ২ হাজার ৩০০ টাকায়, আর খুচরা বাজারে দাম দাঁড়ায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। বৃষ্টির ধরণ পাল্টে গেছে, বাড়ছে নিম্নচাপের সংখ্যা। ফলে আগের মতো ইলিশও আর আসছে না। জেলে মো. শফি জানান, আড়াই বছর আগে এক সপ্তাহের ট্রিপে তাঁর ট্রলারে ২৫ লাখ টাকার ইলিশ ধরা পড়েছিল। এরপর আর কোনোবারই তিন লাখ টাকার বেশি মাছ পাননি।

মাঝি সজীবুল ইসলাম বলেন, “১৪ বছর ধরে সমুদ্রে মাছ ধরছি। এত ঘন ঘন নিম্নচাপ আগে কখনো দেখিনি। শুধু আগস্ট মাসেই অন্তত ছয়বার নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির দেখা মেলেনি।”

জেলেপল্লিতে হাহাকার

জেলে নুর হাসান বলেন, তিন মাসে ২১ জেলে ১০ বার সাগরে গিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই হাতে এসেছে মাত্র ১০০–২০০টি ইলিশ। একবার সাগরে নামতে খরচ হয় প্রায় চার লাখ টাকা। অথচ মাছ বিক্রি করে পাওয়া যায় মাত্র এক লাখ টাকা। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে, চলছে ধারদেনায় সংসার।

কমছে ইলিশ আহরণ

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বছরে বছরে ইলিশের আহরণ কমছে।

  • ২০২২–২৩ অর্থবছর: ৩,৯৭৫ মেট্রিক টন

  • ২০২৩–২৪ অর্থবছর: ২,৫৫৬ মেট্রিক টন

  • ২০২৪–২৫ অর্থবছর: ১,৬২৮ মেট্রিক টন

  • চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই ধরা পড়েছে মাত্র ২৬৭ মেট্রিক টন ইলিশ।

মৎস্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্বও কমছে।

মূল কারণ অনুসন্ধানের দাবি

ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান, কক্সবাজারসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে ৫ হাজারের বেশি ট্রলার রয়েছে এবং প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার জেলে সরাসরি মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু টানা ছয়–সাত মাস মাছ না পাওয়ায় তাঁদের আয় হ্রাস পেয়েছে। তিনি বলেন, “বঙ্গোপসাগরে ইলিশ কমে যাওয়ার সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে গবেষণা জরুরি।”

জেলেরা মনে করেন, গভীর সমুদ্রে দেশি–বিদেশি ট্রলার, ট্রলিং জাল, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও বেহেন্দি জালের ব্যবহারও ইলিশ নিধনের অন্যতম কারণ।

No comments

Powered by Blogger.