আমার মেয়ের কষ্ট সহ্য হচ্ছেনা, বুকটা খালি হয়ে যাচ্ছে
আমার মেয়ের সব পুড়ে গেছে, তোমরা কেউ তার জ্বালা বন্ধ করো। আমি আমার মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। আমার বুকটা খালি হয়ে যাচ্ছে।”
সোমবার (২১ জুলাই) বিকেলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তৃতীয় তলার একটি কক্ষের সামনে ছেলেকে জড়িয়ে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ইয়াসমিন আক্তার।
তিনি জানান, তার মেয়ে নুরে জান্নাত উষা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। মাইলস্টোন স্কুলে পড়ত। বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় তার শরীর পুড়ে গেছে। ইয়াসমিনের দুই সন্তান—এক ছেলে, এক মেয়ে।
তার ছেলে তাহমিন ইসলাম রোহান বলেন, “প্রতিদিনের মতো আজকেও বোনকে স্কুল থেকে আনতে যাই। গিয়ে দেখি স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্লাসরুমে গিয়ে খুঁজেও ওকে পাচ্ছিলাম না। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর ওকে বের করি। দেখি শরীর পুড়ে গেছে। দ্রুত তাকে উত্তরার লুবনা হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে ঢাকা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আনা হয়।”
এমন করুণ পরিস্থিতিতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন আরও অনেক অভিভাবক। কেউ ফোনে আর্তনাদ করছেন, কেউ সন্তানের খোঁজে পাগলের মতো ছুটছেন।
একজন মা ফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, “মিস, আমার বাচ্চা কই? ওর প্রি-টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। ফোন নেই, এই এতক্ষণ হয়ে গেল অথচ কোনো খোঁজ পাইনি। ক্লাস টিচারকেও ফোন করেছিলাম, তিনিও কিছু জানেন না। কেউ বলতে পারছে না আমার ছেলেটা কোথায়।”
আরেকজন অভিভাবক কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “আমার মেয়ে কোথায়? আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন।”
পারুল নামে এক অভিভাবক জানান, তার মেয়ে নুসরাত আক্তার তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ক্লাস, তারপর বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কোচিং থাকে। দিয়াবাড়ীতেই তাদের বাসা। তিনি বলেন, “আমি স্কুলের পাশের মেট্রোরেল ডিপোতে ওকে নিতে অপেক্ষা করছিলাম, তখনই এ দুর্ঘটনার খবর পাই।”
ঘটনাস্থলে থাকা এক অভিভাবক অসহায়ভাবে বলেন, “আমি ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছি না। অনেক খুঁজেছি। আপনারাও পাবেন না ভাই।”
১১ বছর বয়সী আরিয়ান পুরো শরীরে দগ্ধ হয়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন। তার মা মনিকা আক্তার আঁখি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আল্লাহ, আমার সন্তানরে আমার কাছে ফিরাইয়া দাও।”
তিনি আরও বলেন, “সকাল পৌনে ৮টায় স্কুলে গেছে। দেড়টার ছুটি, তারপর কোচিং। সকালে খাবার দিয়ে দিয়েছি, এর মধ্যেই এই ঘটনা ঘটল।”
এর আগে সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী এলাকায় মাইলস্টোন কলেজের মূল ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল।
দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট উদ্ধার কাজে যোগ দেয়, পরে আরও দুটি ইউনিট যুক্ত হয়। বিজিবির দুই প্লাটুন সদস্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অংশ নেয়। দুপুর ১টা ২২ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। উত্তরা, টঙ্গী, পল্লবী, কুর্মিটোলা, মিরপুর ও পূর্বাচল স্টেশনের ফায়ার টিমগুলো যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আইএসপিআরের তথ্যমতে, বিমানটি দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়ন করে এবং মাত্র ১২ মিনিট পর মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়।


No comments