হে আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে দাও
রাজধানীর উত্তরা সোমবার দুপুরে পরিণত হয়েছিল এক বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরীতে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান মাইলস্টোন কলেজ ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় কান্নার রোল। এখন পর্যন্ত ২৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৭০ জনের বেশি। এদের মধ্যে ৪৮ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, অধিকাংশ আহতের শরীরের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
তবে এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেও সবচেয়ে বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে এক শিশু শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার খবর। তার নাম রাইসা মনি (৯)। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বাজড়া গ্রামের মো. সাহাবুল শেখের মেয়ে রাইসা রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পড়ত স্কাইস সেকশনে। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্ঘটনার ঠিক আগে সে ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
কিন্তু সেই ফিরে যাওয়া আর হয়নি রাইসার। বিমান দুর্ঘটনার পর থেকেই তার কোনো খোঁজ মেলেনি। অগ্নিদগ্ধদের তালিকায় তার নাম নেই, মৃত্যুর তালিকাতেও নয়। স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছেন। মা কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, "আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে জীবিত ফিরিয়ে দাও। ওর স্কুলব্যাগটা ক্লাসে পড়ে ছিল, কিন্তু ও কোথায় গেল?"
সোমবার রাতে রাইসার চাচা ইমদাদুল সাংবাদিকদের জানান, "আমার ভাতিজি রাইসা মনির কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। বার্ন ইউনিটসহ উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ করেছি, কিন্তু কোথাও পাইনি।"
রাইসার অনুপস্থিতি যেন প্রতিটি মুহূর্তে নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে তুলছে তার পরিবারকে। বাবা-মা দিশেহারা। তাদের কাছে এই পৃথিবী হঠাৎ করেই থেমে গেছে।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার দুপুরে, মাইলস্টোন কলেজের মূল ভবনের পেছনের অংশে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। শিক্ষার্থীরা তখন ক্লাস শেষ করে কেউ মাঠে, কেউ বা বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু মুহূর্তেই পুরো ক্যাম্পাস পরিণত হয় মৃত্যু কূপে।
আহতদের ভর্তি করা হয়েছে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, লুবানা, সিএমএইচ, কুর্মিটোলা, ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। কিন্তু এখনো অনেকের কোনো খোঁজ নেই। রাইসার মতো আরও কিছু শিশুও এখনো নিখোঁজ। তাদের পরিবারগুলো বুক বেঁধে হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষা করছে— যদি কেউ এসে বলে, “এখানে একজন মেয়ে আছে, নাম রাইসা।”
প্রিয়জনকে হারিয়ে স্বজনরা এখন শুধু চোখের জলে খুঁজে ফিরছেন সেই চেনা মুখগুলো। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রাইসার কোনো খোঁজ মিলছে না। হাসপাতালের দেয়ালগুলো কেবল কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠছে— তিনতলা থেকে নেমে যাওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটি কি কোথাও এখনো বেঁচে আছে?
এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ও রাইসার পরিবারের হৃদয়বিদারক আকুতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, উন্নয়ন আর প্রযুক্তির অগ্রগতির মাঝেও একটি ব্যর্থ মুহূর্ত কত শত জীবনের স্বপ্ন ও আনন্দ কেড়ে নিতে পারে। এখন প্রয়োজন দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার তৎপরতা চালানো এবং নিখোঁজদের সন্ধানে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। যেন রাইসার মতো আর কোনো শিশুকে হারিয়ে না যেতে হয় অজানার অন্ধকারে।


No comments