বিএনপির এক দিনেই ২০ নেতা বহিষ্কার
নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে একদিনে বিএনপির ২০ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই দিনে বিলুপ্ত করা হয়েছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি। গত মঙ্গলবার (তারিখ অনুল্লিখিত) এসব সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে। এসব ঘটনা ঠেকাতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিশেষ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। অভিযোগ উঠার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে দল।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, চাঁদাবাজি ও সংঘাত সৃষ্টির মতো অভিযোগে বিএনপি থেকে যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন চেয়ারম্যান, মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব গাজী নিজাম উদ্দিন, বারৈয়ারহাট পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম মিয়াজী, যুবদল নেতা সিরাজুল ইসলাম ও কামাল উদ্দিন। একই সঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরীর প্রাথমিক সদস্য পদসহ ভাইস চেয়ারম্যান পদও স্থগিত করা হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বিএনপির কাউন্সিলকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. সৈয়দ আলম এবং সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ড. টিএম মাহবুবুর রহমানকে।
এ ছাড়া চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ইমাম হোসেন গাজী, জেলা বিএনপির সদস্য আব্দুল মান্নান লস্কর, মতলব দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া এবং কুমিল্লার লাকসাম পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শফিউল্লাহকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) আট চিকিৎসককেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরা হলেন ডা. খায়রুল ইসলাম, ডা. রফিকুল কবির লাবু, ডা. ফারুক হোসেন, ডা. মাহবুব আরেফীন রেজানুর রঞ্জু, ডা. এমএ কামাল, ডা. সৈয়দ ইমতিয়াজ উদ্দিন সাজিদ, ডা. শাওন বিন রহমান এবং ডা. রাকিব উজ জামান। দল জানিয়েছে, এই চিকিৎসকদের ভবিষ্যতে কোনো সংগঠন অন্তর্ভুক্ত করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সংগঠনের নিয়ম ভঙ্গের দায়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ৩ হাজার ২৪৩ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীই ১ হাজার ৮০০ জন। তাদের মধ্যে ৮০০ জনকে বহিষ্কার, ৫০ জনের পদ স্থগিত, ৭০০ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ, ১০০ জনকে সতর্ক করা এবং ১৫০ জনকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের চিঠি দেওয়া হয়েছে। ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলও নিজ নিজ সংগঠনের বেপরোয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৪৭৮টি সংঘর্ষে অন্তত ৮০ জন নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, গত ১০ মাসে ৬৮ জন বিএনপি নেতাকর্মী খুন হয়েছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেউ কেউ দলের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। দল এসব বিচ্ছিন্ন অপকর্মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। অপরাধ করলে কেউ রেহাই পাচ্ছে না।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ পরিবার। অনেকে দলের নাম ভাঙিয়ে অনৈতিক কাজ করছেন। কিন্তু এসব ঘটনা জানতে পারলেই দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই বিষয়ে কোনো ছাড় দিচ্ছেন না। তিনি ইতোমধ্যে ৪ হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের উসকানিতে প্রতিক্রিয়া দেখাতে নিষেধ করেছেন।
দলের সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ গুরুতর অভিযোগ এসেছে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। হাইব্রিড ও বিশৃঙ্খল নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করে দল থেকে সরাতে হাইকমান্ড সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় এসব কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, বহিষ্কৃতদের মধ্যে প্রায় ১৬০০ জন ইতোমধ্যে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেছেন। তবে এখনই গণহারে বহিষ্কার প্রত্যাহার না হলেও, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপি চায় না কোনো নেতার অপকর্মের দায় দল বহন করুক। তাই অপরাধী যেই হোক, দলের শৃঙ্খলা ভাঙলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।


No comments