বাংলাদেশের পোশাকের কার্যাদেশ এখন অন্য দেশে চলে যাচ্ছে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস সংকট এবং বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে নতুন অনেক রপ্তানি অর্ডার প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রবিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিবিএ) আয়োজিত “বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মো. মোফাজ্জল হোসেন পাভেল।
বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবরোধ, লোডশেডিং এবং গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা সময়মতো উৎপাদন সম্পন্ন করতে পারছে না। ফলে অনেক রপ্তানিকারক বাধ্য হচ্ছেন ব্যয়বহুল বিমানপথে পণ্য পাঠাতে, যা খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলছে।
২০২৬ সালে স্বর্ণের দাম কোথায় পৌঁছাতে পারে, জানাল মর্গ্যান স্ট্যানলি
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, “আমরা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশের সার্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে দ্বিধায় রয়েছেন। দ্রুত সমাধান না পেলে এই সংকট আরও গভীর হবে।”
বিজিবিএর মহাসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, “গ্যাসের স্বল্পতা ও প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না, ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হচ্ছেন বিমানপথে পণ্য পাঠাতে, যা বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।” তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য অর্জনে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “টেক্সটাইল ও পোশাক খাত জাতীয় রপ্তানির ৮৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে, অথচ আমরা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাচ্ছি না। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে এবং নতুন অর্ডারের প্রবাহ কমে যাচ্ছে।”
বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, বিমানবন্দরের জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক বাধা মিলিয়ে গার্মেন্টস খাত এখন একপ্রকার সংকট ব্যবস্থাপনার পর্যায়ে পৌঁছেছে।” তিনি শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে ৫০ জনের পরিবর্তে ২০ জন শ্রমিকের সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “আমেরিকার শুল্কনীতি ও শ্রমিক ইস্যুর কারণে রপ্তানি অর্ডারে প্রভাব পড়ছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমাদের দল ক্ষমতায় গেলে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশের) উত্তরণের সময় বাড়ানোর জন্য কাজ করবে, যাতে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতির সুযোগ পান।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সরকারের সময়ে ব্যাংক খাত থেকে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বিপুল অর্থ লুট করেছেন, যার ফলে আর্থিক খাত নাজুক হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে প্রশাসনিক সংস্কার অপরিহার্য।”
তিনি যোগ করেন, “আমরা ক্ষমতায় এলে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলব। অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজ করা হবে।”
এ সময় বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকে উদ্দেশ করে বলেন, “তিনি উন্মাদের মতো কথা বলেন। দুঃখের বিষয়, বিজিএমইএর সভাপতি এখনো প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। তাহলে দায়িত্ব নেওয়ার মানে কী?”
তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখছি কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছে, অথচ প্রশাসন নীরব। যেখানে বিমানবন্দর পুড়ে যায়, সেখানে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার দেবে কেন? এর অদৃশ্য ক্ষতি অনেক বড়।”
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমাদের মুক্তির পথ হলো নির্বাচন। দয়া করে নির্বাচন দিন।”
শওকত আজিজ রাসেল আরও অভিযোগ করেন, “প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব তার ফেসবুক পেজে দায়িত্বহীন মন্তব্য করে মানুষকে বিব্রত করছেন। সঠিক লোক যদি সঠিক জায়গায় না থাকে, তাহলে সঠিক সিদ্ধান্তও হবে না।
আরো পড়ুন


No comments