ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে এ পর্যন্ত কতটি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে, এবং বাংলাদেশ কবে দিয়েছে?
যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে। এরপর একই ঘোষণা দিয়েছে পর্তুগাল। আরও শিগগিরই ফ্রান্সও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে রয়েছে। এর আগে, চলতি বছরের ২০ মার্চ মেক্সিকো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
এই চার দেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যের মধ্যে বর্তমানে ১৫১টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলের সংঘটিত জাতিগত নিধনের প্রেক্ষাপটে, এসব প্রভাবশালী দেশের স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ এই স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। স্বাগত জানিয়েছে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসও। অন্যদিকে, ইসরায়েল এই পদক্ষেপকে তীব্রভাবে নিন্দা জানিয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের নতুন নির্বিচার হামলা শুরু হয়। দুই বছরের মধ্যে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ২১ লাখের বেশি মানুষের বসবাসকারী এই অবরুদ্ধ উপত্যকায় বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সম্প্রতি গাজার বৃহত্তম শহর গাজা নগরীতে ইসরায়েল সর্বাত্মক হামলা চালাচ্ছে, যার লক্ষ্য জনবহুল নগরীটি পুরোপুরি দখল করা।
জাতিসংঘের রোমভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ প্যানেল (আইপিসি) গাজায় দুর্ভিক্ষের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। এছাড়া, জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গাজায় জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, যুদ্ধ ও গণহত্যা বন্ধে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি এই চাপ আরও বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশসমূহের সময়রেখা:
২০২৫: পর্তুগাল, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো।
২০২৪: আর্মেনিয়া, স্লোভেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন, বাহামা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, জ্যামাইকা, বার্বাডোস।
২০১৯: সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস।
২০১৮: কলম্বিয়া।
২০১৫: সেন্ট লুসিয়া, হলি সি।
২০১৪: সুইডেন।
২০১৩: হাইতি, গুয়েতেমালা।
২০১২: থাইল্যান্ড।
২০১১: আইসল্যান্ড, ব্রাজিল, গ্রেনাডা, এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, ডমিনিকা, বেলিজ, সেন্ট ভিনসেন্ট, হন্ডুরাস, এল সালভাদর, সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাইবেরিয়া, লেসোথো, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, সুরিনাম, পেরু, গায়ানা, চিলি।
২০১০: ইকুয়েডর, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা।
২০০৯: ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ভেনিজুয়েলা।
২০০৮: আইভরি কোস্ট, লেবানন, কোস্টারিকা।
২০০৬: মন্টিনিগ্রো।
২০০৪: পূর্ব তিমুর।
১৯৯৮: মালাউয়ি।
১৯৯৫: কিরগিজস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাপুয়া নিউগিনি।
১৯৯৪: উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান।
১৯৯২: বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, জর্জিয়া, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, কাজাখস্তান।
১৯৯১: ইসওয়াতিনি।
১৯৮৯: ফিলিপাইন, ভানুয়াতু, বেনিন, ইকুয়েটরিয়াল গিনি, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, রুয়ান্ডা।
১৯৮৮: বাংলাদেশ, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, ভুটান, বুরুন্ডি, বতসোয়ানা, নেপাল, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো, পোল্যান্ড, ওমান, গ্যাবন, সাও তমে অ্যান্ড প্রিন্সেপ, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, সিয়েরা লিওন, উগান্ডা, লাওস, চাদ, ঘানা, টোগো, জিম্বাবুয়ে, মালদ্বীপ, বুলগেরিয়া, কেপ ভার্দে, উত্তর কোরিয়া, নাইজার, রোমানিয়া, তানজানিয়া, হাঙ্গেরি, মঙ্গোলিয়া, সেনেগাল, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কমোরোস, গিনি, মালি, গিনি-বিসাউ, চীন, বেলারুশ, নামিবিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন, ভিয়েতনাম।
বিশ্বের ধনী দেশগুলোর জোট জি-৭-এর মধ্যে প্রথম ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য ও কানাডা।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া। এই দেশগুলোর ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এদের মধ্যে ফিলিস্তিনকে এখনও স্বীকৃতি দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স। তবে ফ্রান্স শিগগিরই স্বীকৃতি দেওয়ার পথে রয়েছে।
২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে ‘সদস্যবহির্ভূত পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র তা ভেটো করে। পরের মাসে সাধারণ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব পাস হয়। তবে এখনো ফিলিস্তিন পূর্ণ সদস্যপদ পাননি।
বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিন সম্পর্ক:
ঢাকায় অবস্থিত ফিলিস্তিনি দূতাবাসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের সম্পর্ক সবসময়ই উষ্ণ, ভ্রাতৃপ্রতিম ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী এবং ইসরায়েলের দখলবিরোধী। ঢাকায় ফিলিস্তিনের দূতাবাস রয়েছে, তবে বাংলাদেশের ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সরাসরি বা পরোক্ষ বাণিজ্যও নিষিদ্ধ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ফিলিস্তিনের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দেয় এবং জনগণের পক্ষ থেকে চিকিৎসক দল ও ত্রাণ পাঠানো হয়।


No comments