Header Ads

আমরা ঋণের দায় আর খাওয়ার অভাবে মরে গেলাম

                       
                         

আমরা ঋণের দায় আর খাওয়ার অভাবে মরে গেলাম



 রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামুনশিকড় গ্রামে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ঋণ ও অভাব-অনটনের চাপে স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করে আত্মহত্যা করেছেন মিনারুল ইসলাম (৩৫)।

আজ শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে এ ঘটনা জানাজানি হয়। পরে দুপুরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতরা হলেন মিনারুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী মনিরা বেগম (২৮), ছেলে মাহিন (১৩) ও মেয়ে মিথিলা (২)। মাহিন স্থানীয় খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। মিনারুল কৃষিকাজ করতেন।

ঘটনার বিবরণ

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিনারুল আগে জুয়া খেলতেন এবং এ কারণে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। দেড় বছর আগে তাঁর বাবা রুস্তম আলী ধানিজমি বিক্রি করে প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করেন। কিন্তু এরপরও তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকা ঋণ বাকি ছিল। এ ঋণের জন্য প্রতি সপ্তাহে তাঁকে ২ হাজার ৭০০ টাকার বেশি কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু নিয়মিত কিস্তি চালাতে পারছিলেন না মিনারুল। এ কারণে বাবাকে আবার জমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে বললেও তিনি রাজি হননি। এ নিয়ে মিনারুল বাবা–মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং সন্তানদেরও তাঁদের সঙ্গে মিশতে দিতেন না।

আজ সকালে মিনারুলের বাবা বাজার থেকে মাছ কিনে এনে নাতনিকে খাওয়াতে ডাকতে যান। কিন্তু সাড়া না পেয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন মিনারুল ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছেন। খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা জড়ো হন এবং ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।

পশ্চিম দিকের ঘরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় মিনারুলের মরদেহ। একই ঘরের বিছানায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় পড়ে ছিল ছেলে মাহিনের মরদেহ। সেখানেই পাওয়া যায় দুই পৃষ্ঠার হাতে লেখা চিরকুট। ভেতরের আরেক কক্ষে স্ত্রীর গলায় মোবাইল চার্জারের তার প্যাঁচানো অবস্থায় এবং ছোট মেয়ে মিথিলার মরদেহ পড়ে ছিল।

চিরকুটে যা লেখা ছিল

চিরকুটে মিনারুল লিখেছেন—

  • “আমরা চারজন পৃথিবী থেকে বিদায় নিলাম, আর দেখা হবে না। খোদা হাফেজ।”

  • তিনি স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

  • চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, তাঁদের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করা যাবে না।

  • আরও লিখেছেন, “আমি একা মরলে আমার বউ-সন্তানরা কষ্টে বাঁচবে। তাই সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মরলাম। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।”

  • তিনি অনুরোধ করেছেন, তাঁর বাবা যেন তাঁদের দাফনের খরচ না দেন এবং বড় ভাই যেন জানাজায় অংশ না নেন।

পুলিশের বক্তব্য

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মিনারুল স্ত্রী ও সন্তানদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং এ ঘটনায় মামলা হবে। ফরেনসিক টিম ও পিবিআই ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে।

পরিবারের বক্তব্য

মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী বলেন, “ছেলের কিছু ঋণ ছিল। আগের ঋণ আমি ধানিজমি বিক্রি করে শোধ করেছি। তবে নতুন করে আর কীভাবে ঋণ করেছে, তা জানি না।”

মা আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, “ভরণপোষণ আমি দিতাম। ধার-দেনার জন্য আগেও জমি বিক্রি করেছি। আবার নতুন করে ঋণ করেছে। আজ সকালে মাছ কিনে আনলে ডাকাডাকি করতে গিয়ে দেখি ছেলে ঝুলে আছে।”

প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া

ঘটনার পর আশপাশের মানুষ বাড়িতে ভিড় করেন। শোক ও কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সাহেদ আলী জানান, মিনারুল নিয়মিত কিস্তির চাপ ও বর্ষাকালে কাজের অভাবে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কয়েক দিন আগেই তাঁর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে চালসহ কিছু জিনিসপত্র কিনেছিলেন।

No comments

Powered by Blogger.