অন্তরালে জোটগঠনের হিসাব-নিকাশ
দেশ এখন নির্বাচনমুখী। রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ মতো ভোটের মাঠে সক্রিয়। ভোটারদের কাছে ধরনা দিচ্ছে তারা। এরই মধ্যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছু দল নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তবে কার্যত শেষ পর্যন্ত তারাও নির্বাচনের মাঠেই থাকছে। বড় দল বিএনপিকে চাপের মধ্যে রাখতে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি দল ভোটে না যাওয়ার হুমকি দিলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটিও কৌশলের অংশ। আসলে পেছনে মূল লক্ষ্য আসন সমঝোতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন ঘিরে মূলত তিনটি বড় রাজনৈতিক জোট গঠনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সময় যত এগোচ্ছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের লক্ষ্য সামনে রেখে জোট গঠন প্রক্রিয়াও তত গতি পাচ্ছে। বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ১২ দল, সমমনা জোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি গণতন্ত্র মঞ্চ, এবি পার্টি, এনসিপি, গণ-অধিকার পরিষদসহ বেশ কিছু দলের সঙ্গে বিএনপির নিয়মিত বৈঠক ও যোগাযোগ চলছে। তবে বিএনপি কোনোভাবেই জামায়াতের সঙ্গে জোট করবে না।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই পীরের দল) ও হেফাজতে ইসলামের মামুনুল হক নেতৃত্বাধীন অংশ নিয়ে জোট গঠনের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। এর বাইরে এনসিপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, এবি পার্টি, গণ-অধিকার পরিষদসহ আরও কয়েকটি দল পৃথক জোটের পথে এগোচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত এ জোট বিএনপির সঙ্গে একীভূত হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
জামায়াতের ঐক্যচেষ্টা
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, "যারা নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বলছে, এটি তাদের কৌশল। আসল লক্ষ্য আসন সমঝোতা। সবাই আসলে নির্বাচনমুখী।" তিনি জানান, বিএনপির সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চসহ যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সম্পর্ক উষ্ণ। আগামী ১৮ আগস্ট বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের বৈঠকে জোট সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। তিনি আরও জানান, জামায়াত ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস ও হেফাজতে ইসলামের পাঁচটি দলকে নিয়ে জোট গঠনের চেষ্টা করছে জামায়াত। তবে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন হেফাজতের অংশ এতে না-ও থাকতে পারে।
আসন সমঝোতা
জানা গেছে, আসন বণ্টন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে এনসিপি, গণতন্ত্র মঞ্চ, এবি পার্টি, গণ-অধিকার পরিষদের আলোচনা চলছে। বিএনপি জোটসঙ্গীদের সর্বোচ্চ ৬০টি আসন ছাড়তে রাজি। কিন্তু এনসিপি ৩০টি আসনের দাবি করছে। তারা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দর-কষাকষি করছে। এই অবস্থায় বিএনপি ১৭টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি নয়। অন্যদিকে জামায়াত কমপক্ষে ৫০টি আসন চাইছে। দাবি পূরণ না হলে তারা নির্বাচনে না যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
আওয়ামী লীগের ভরসা জাতীয় পার্টি
রাজনৈতিক সূত্র জানায়, প্রধান তিন জোটের বাইরে জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। আদালতের এক আদেশে জি এম কাদেরের ওপর থেকে স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে দলটি। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিত ছাড়া জাতীয় পার্টির এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না। অনেকেই মনে করছেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক এবার জাতীয় পার্টির দিকে ঝুঁকতে পারে। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রংপুর ও খুলনা অঞ্চলের বেশ কিছু আসনে জাতীয় পার্টি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, "সরকার ও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখলে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে সরকার কোনো কোনো দলকে সুবিধা দিচ্ছে, যা বড় ধরনের বৈষম্য। আওয়ামী লীগের রিজার্ভ ভোটসহ প্রায় ৫২ শতাংশ ভাসমান ভোট রয়েছে। সেগুলো লক্ষ্য করেই জাতীয় পার্টি এগোচ্ছে।"
বিশ্লেষকদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, "যারা বলছে নির্বাচনে যাবে না, এটি রাজনৈতিক চাপ। তবে নির্বাচন ছাড়া বিকল্প নেই। বিএনপিকে বড় দল হিসেবে প্রয়োজনে আরও ছাড় দিতে হবে। জামায়াত বা এনসিপি—দেশের স্বার্থেই তারা নির্বাচনে অংশ নেবে।"
বিএনপির অবস্থান
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, "১২ দল, সমমনা জোটসহ যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। আসন বণ্টন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে কেউ বিএনপির জোটে যুক্ত হতে চাইলে আলোচনা হতে পারে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনে আমরা এখনো ইতিবাচক।"
জামায়াতের অবস্থান
জামায়াতে ইসলামী নেতারা বলেছেন, ইসলামী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে বিএনপির সঙ্গে জোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ বিএনপি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট জানিয়েছে তারা জামায়াতের সঙ্গে যাবে না।
অন্যান্য দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, "নির্বাচন ছাড়া কোনো পথ নেই। ইসলামী দলগুলোর জোট হতেই পারে। তবে বিএনপি-জামায়াত জোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।"
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, "বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক সব দলের সঙ্গে সম্মানজনক সমঝোতা করতে পারে। আমাদের দলসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে যৌথভাবে ভোটের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আমরা এখনো দল গোছাচ্ছি।
অন্যদিকে এনসিপির শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।


No comments