Header Ads

ইসলামী ব্যাংকগুলোর মুনাফায় তীব্র পতন

                    
                         

ইসলামী ব্যাংকগুলোর মুনাফায় তীব্র পতন


২০২৪ সালে দেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক চিত্র আশানুরূপ হয়নি। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর ইসলামী ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা দাঁড়ায় মাত্র ৬৭০ কোটি টাকায়। আগের বছর এই অঙ্ক ছিল প্রায় ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা বা তিনগুণেরও বেশি।

অন্যদিকে, সার্বিক ব্যাংক খাতেও নিট মুনাফার পতন ঘটেছে। ২০২৩ সালে যেখানে ব্যাংক খাতের সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায়। এক বছরে ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা বা ১৮ শতাংশেরও বেশি।

মুনাফা কমার মূল কারণ

খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপকে মুনাফা হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। আগে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন সুবিধার কারণে খেলাপি ঋণ গোপন রাখা হতো। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে প্রভিশনের চাপ বেড়ে গেছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিট মুনাফায়।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ জানান, "খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিট মুনাফার বড় পতনের কারণ। আগে যেসব ঋণ গোপন রাখা হতো, এখন তা প্রকাশ্যে আসছে। এতে প্রভিশন সংরক্ষণ বাড়ছে এবং মুনাফা কমছে।"

ইসলামী ব্যাংকগুলোর চাপ

ইসলামী ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে আমানত সংগ্রহ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় আমানত প্রত্যাহারের চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ওপর বিশেষ নিরীক্ষার কারণে খেলাপি বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে, যা নিট মুনাফাকে আরও নিচে নামিয়ে দিয়েছে।

সার্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, নিট মুনাফা বাড়লে ব্যাংক শেয়ারহোল্ডাররা বেশি লভ্যাংশ পান, সরকারও রাজস্ব পায় এবং ব্যাংকগুলো মূলধন বাড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করে। কিন্তু মুনাফা কমলে লভ্যাংশ কমে যায়, ব্যাংকের শেয়ারের দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়ে যায়। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণও কমে যায়, যা পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২৪ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা।

গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশের কম। আর ২০২৩ সালের মার্চ শেষে এই অঙ্ক ছিল মাত্র ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা বা প্রায় ১১ শতাংশ। ফলে মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা—যা দেশের ব্যাংক খাতের জন্য মারাত্মক সংকেত।

অতীতের তুলনা

করোনা মহামারির সময়ে, অর্থাৎ ২০২০ সালে ব্যাংক খাতে নিট মুনাফায় বড় ধাক্কা এলেও ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। ২০১৯ সালে নিট মুনাফা ছিল ৬ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, যা ২০২০ সালে নেমে যায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটিতে। এরপর ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ৫ হাজার ২০ কোটি, ২০২২ সালে ১৪ হাজার ২৩০ কোটি এবং ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৪ সালে আবার পতন ঘটে, নিট মুনাফা নেমে আসে ১২ হাজার ১৫৮ কোটিতে।

উপসংহার

২০২৪ সালের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ব্যাংক খাত বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলো মারাত্মক চাপে রয়েছে। ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণ, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন নিশ্চিত না হলে সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.