জুলাই ঘোষণাপত্রে কী আছে? জানুন বিস্তারিত
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ‘৩৬ জুলাই উদ্যাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে "জুলাই ঘোষণাপত্র" পাঠ করেন। এই দলিলটি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে প্রণীত। নিচে ঘোষণাপত্রটির মূল বিষয়বস্তু পুনর্লিখন করে তুলে ধরা হলো, যাতে ভাষা সহজ, তথ্য স্পষ্ট ও গঠনসংগত থাকে:
জুলাই ঘোষণাপত্র
১. ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে।
২. মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন।
৩. স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭২ সালের সংবিধান ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়।
৪. বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়, যার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।
৫. ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে ও ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল হয়।
৬. ১/১১-এর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে ফেলে শেখ হাসিনার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।
৭. গত ১৬ বছরে সংবিধান পরিবর্তন ও একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েম করে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করা হয়।
৮. এই শাসনব্যবস্থায় গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মতপ্রকাশের অধিকার হরণ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়।
৯. শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একনায়কতান্ত্রিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত করে।
১০. উন্নয়নের নামে দুর্নীতি, অর্থপাচার, ব্যাংক লুট ও পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে।
১১. এই সময়ের মধ্যে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে।
১২. বিদেশি আধিপত্য রোধে আন্দোলনও কঠোরভাবে দমন করা হয়।
১৩. ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
১৪. ভিন্নমতের প্রতি সহিংসতা ও কোটানির্ভর নিয়োগে বৈষম্য বেড়েছে।
১৫. দীর্ঘদিনের দমননীতির কারণে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে।
১৬. কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা গণআন্দোলনে যুক্ত হয়।
১৭. ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সমাজের সব স্তরের মানুষ অংশ নেয়। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়। সামরিক বাহিনীর একটি অংশ জনগণের পাশে দাঁড়ায়।
১৮. ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে গণভবনমুখী লংমার্চের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগে বাধ্য হন।
১৯. এই গণ-অভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ ও যুক্তিসংগত।
২০. এরপর ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
২১. ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের জনগণের আকাঙ্ক্ষা এই অভ্যুত্থানে প্রকাশ পায়।
২২. জনগণ সুশাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার চায়।
২৩. ফ্যাসিস্ট সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের দ্রুত বিচার দাবি করা হয়।
২৪. অভ্যুত্থানে শহীদদের জাতীয় বীর ঘোষণা ও আহতদের আইনি সুরক্ষার দাবি জানানো হয়।
২৫. একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠনের পর তা সংবিধান সংস্কার করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেবে।
২৬. পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়।
-
২০২৪ সালের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে এ ঘোষণাপত্র ভবিষ্যৎ সরকার কর্তৃক সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির প্রত্যাশা জানানো হয়।
২৮. অবশেষে, এই দলিলটি ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বিজয়ী জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে গৃহীত ও প্রণীত হয়।


No comments