আমার পোলারে খুন করার অধিকার কেডা’ দিসে
শুক্রবার দুপুর ১২টায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের বাইরে ছেলের লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আমিনুল ইসলাম। ভেতরে চলছিল তার ছেলে মোহাম্মদ সায়েমের (২৪) মরদেহের ময়নাতদন্ত। সায়েমকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা নগরের অশোকতলা বিসিক শিল্পনগরীর একটি কারখানায় হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ছেলের মৃত্যুতে আমিনুল বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলের বিরুদ্ধে যদি কেউ অন্যায় করত, তাকে আইন অনুযায়ী সাজা দেওয়া যেত। কিন্তু কারও কি অধিকার ছিল তাকে খুন করার? আমি চাই, হত্যাকারীদের বিচার হোক।
আমিনুল ইসলাম একজন রিকশাচালক। তাঁর বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সনাতন গ্রামে। ১৯৯৮ সালে তিনি কুমিল্লায় আসেন এবং এখন কুমিল্লা শহরতলির দিদার মার্কেটে থাকেন। তাঁর স্ত্রী রহিমা বেগম প্রায় দুই বছর আগে মারা গেছেন। পরিবারের মধ্যে তিন ছেলে, দুই মেয়ে আছে; এক মেয়ে ও দুই ছেলে বিবাহিত। বর্তমানে আমিনুলের সংসার ১১ বছর বয়সী কন্যা আফসানা আক্তার এবং সায়েমকে নিয়েই।
সায়েম নগরের একটি মাদ্রাসায় নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর পড়াশোনা থেকে ছুটি নেন এবং এরপর এলাকায় কিছু দুষ্ট ছেলের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন।
সায়েমের মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার রাতেই আমিনুল ইসলাম কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় ৪৫–৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা দুইটা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিক প্রথম আলোকে বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাইনি। তবে আশপাশের ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করছি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, সায়েম এলাকায় চাঁদাবাজি করত। তার বিরুদ্ধে আগে তিনটি অপরাধমূলক মামলা আছে। যেসব ব্যক্তি এতে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, সায়েম বিসিক ও অশোকতলা এলাকায় চাঁদাবাজি করত। বুধবার রাত দেড়টার দিকে সায়েম জান্নাতুল ফুড প্রোডাক্টস কারখানায় চাঁদা দাবিতে এসে দুজন স্টাফকে মারধর করেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সে আবার একই কারখানায় গিয়ে চাঁদা দাবির চেষ্টা করলে কর্মীরা তাকে হাত-পা বেঁধে মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সায়েমের বাবা দাবি করেন, তার ছেলে পরিকল্পিতভাবে খুন হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার ছেলেটা খারাপ ছিল না। মায়ের মৃত্যুর পর কয়েকজন এলাকার দুষ্ট ছেলের সঙ্গে মেশা শুরু করার কারণে মানুষ তাকে খারাপ বলার চেষ্টা করেছে। আমাদের বাড়ি রংপুর, তাই সহজেই ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে।”
জান্নাতুল ফুড প্রোডাক্টসের মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, “তিন মাস ধরে সায়েম আমাদের সঙ্গে ঝামেলা করত। কখনো মোবাইল ছিনতাই করত, কখনো সরাসরি চাঁদা দাবী করত। ঘটনার দিন সে ছুরি নিয়ে কর্মীদের আঘাত করার চেষ্টা করলে আমাদের কর্মীরা তাকে আটকিয়ে মারধর করে। পরে লোকজন এসে গণপিটুনি দেয়, যার ফলে সে মারা যায়। ঘটনার পর তার সঙ্গীরা সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে নিয়ে গেছে।”
কারখানার পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, ভবনের মেঝেতে রক্তের দাগ দেখা যায় এবং কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙা বা মুখ উল্টো করে রাখা আছে।


No comments