নারীঘটিত’ বলে কি তুহিন হত্যার রহস্য আড়াল করার চেষ্টা চলছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেছেন, গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তার মোড়ে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে শত শত মানুষের সামনে গলা কেটে এবং কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার রবিউল ইসলাম জানান, এটি একটি ‘নারীঘটিত’ ভিডিও ধারণের ঘটনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। পুলিশের এই বক্তব্যে তিনি আপত্তি জানান।
সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে পান্না বলেন, দেশের একটি পরিচিত প্রবণতা হলো যখন কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে, সেটিকে অন্য খাতে প্রবাহিত করতে ‘নারীঘটিত’ তকমা দেয়া হয়। তুহিনের ফেসবুক স্ট্যাটাস ও সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন সরব, প্রতিবাদী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন একজন ব্যক্তি। তাই তার হত্যাকাণ্ড নিছক কোনো নারীঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এর পেছনে বড় কোনো উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা থাকতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘নারীঘটিত’ বলেই কি আসল রহস্য চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে?
পান্না আরো বলেন, তুহিনকে জনসম্মুখে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা দেশে ব্যাপক উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ঘটনায় নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। যদিও পুলিশের প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে কিছু অংশ সত্যতা পেলেও, পুলিশ যে একাধিকবার আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার রবিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৭টার দিকে চান্দনা চৌরাস্তার মোড়ে এক নারীর সঙ্গে বাদশা মিয়া নামের এক ব্যক্তি বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। ওই নারীর পক্ষ থেকে ৪-৫ জন তাকে আঘাত করে, বাদশা পালিয়ে যান। সেই সময় পাশের রাস্তা থেকে তুহিন ভিডিও করছিলেন। সন্ত্রাসীরা তাকে ভিডিও মুছে ফেলতে বললে তুহিন ভয় পেয়ে আশ্রয় নেন এক চায়ের দোকানে। কিন্তু দুর্বৃত্তরা তাকে অনুসরণ করে সেখানে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে।
পুলিশের এই বয়ানে আপাতত প্রশ্ন তোলা হয়নি। কিন্তু রবিউল ইসলাম যখন বলেন, এটি চাঁদাবাজির ঘটনা নয়, বরং ‘নারীঘটিত’ ভিডিও ধারণের প্রতিক্রিয়ায় সন্ত্রাসীরা তুহিনকে হত্যা করেছে—তাতে প্রশ্ন উঠেছে।
পান্না বলেন, স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, হত্যার কিছুক্ষণ আগে তুহিন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লাইভ করেছিলেন। তাহলে কেন পুলিশ বারবার ‘নারীঘটিত’ শব্দটি ব্যবহার করছে? দেশের বাস্তবতায় বড় বড় অপরাধ বা হত্যাকাণ্ডগুলো অন্য খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন মহল থেকে ‘নারীঘটিত’ তকমা বসানোর প্রবণতা দেখা যায়। পুলিশ কমিশনার বা উপ-পুলিশ কমিশনার চাইলে বলতে পারতেন, এটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সময় ভিডিও ধারণের কারণে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু তারা ‘নারীঘটিত’ শব্দটাই বারবার ব্যবহার করেছেন, যা সন্দেহজনক।
পান্না আরো বলেন, তুহিন ফেসবুকে চাঁদাবাজি নিয়ে সরাসরি কোনো লাইভ করেননি, তবে গাজীপুরের মতো এলাকায় যেখানে ফুটপাত দখল, ড্রেনেজ সমস্যা ও চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের সমস্যা, সেখানে একজন সচেতন সাংবাদিকের চুপ থাকা অবিশ্বাস্য। তুহিন হত্যার আগের দিন আরেক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণে পুলিশের সামনে মারধরের শিকার হন।
তিনি বলেন, তুহিনের ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলোতে তার অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন এবং ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সমালোচনা প্রকাশ পেয়েছে। এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন—‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে আগে কইতো রাজাকার, এখন কয় স্বৈরাচার। আর জামায়াতের বিরুদ্ধে বললে বলে শাহবাগি! ৭১ আর ২৪-এর বেচাকেনায় আমজনতার জুস বের হয়ে যাচ্ছে।’ আরেকটি স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন—‘জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছেন, তাদের বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা খরচ নাকি প্রত্যেকের ১২ কোটি টাকা? কী বলেন, হিসাবটা ঠিক আছে?’
পান্না প্রশ্ন তোলেন, এই হত্যাকাণ্ড কি নিছক কোনো ঘটনার আকস্মিক ফল নাকি পরিকল্পিত খুন? সত্যটি আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে কি? যদি একজন সাংবাদিক হত্যার বিচার নিশ্চিত না হয়, তাহলে দেশে বাকস্বাধীনতা নয়, ভয়ই চিরস্থায়ী হয়ে যাবে।


No comments