বাংলাদেশের তৈরি পোশাকে বিশ্ববাজারে নতুন দাপটের পথে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ৭ আগস্ট থেকে চীন ও ভারতের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে বাংলাদেশ এখন মার্কিন ক্রেতাদের নজরে এসেছে। বিশেষ করে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাত নতুন সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকরা বলছেন, ক্রেতারা দ্রুত অর্ডার স্থানান্তর করছেন এবং বাংলাদেশকে নতুন বিনিয়োগ ও অর্ডারের কেন্দ্র হিসেবে দেখছেন। এই পরিস্থিতি কেবল রফতানি বাড়াচ্ছে না, বরং নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির সুযোগও তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে টি-শার্ট রফতানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টি-শার্ট রফতানিতে বাংলাদেশ শীর্ষে উঠেছে। নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও চীনের মতো দেশের অগ্রাধিকার পিছনে ফেলে বাংলাদেশ এ অবস্থান অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ১১৭টি দেশ থেকে মোট ৩৫২ কোটি ডলারের টি-শার্ট আমদানি করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এসেছে ৩৭ কোটি ৩২ লাখ ডলার।
১৯৮৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই বাজারে হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, হংকং, জ্যামাইকা, মেক্সিকো ও চীনের মতো দেশ আধিপত্য বজায় রেখেছিল। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সব দেশের পণ্যে ন্যূনতম ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে বাংলাদেশের টি-শার্ট বাজারে শীর্ষে পৌঁছেছে।
মার্কিন পাল্টা শুল্ক ও বাংলাদেশের বাজারে প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যে ৩০% এবং ভারতের পণ্যে ২৫% শুল্ক আরোপ করেছে। চীনের ওপর শুল্কের কারণে মার্কিন ক্রেতারা বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেছেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে চীনের হারানো বাজার দখলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
জানুয়ারি থেকে জুনে চীনের পোশাক রফতানি কমেছে ১১০ কোটি ডলার, ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে ১১৯ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশের বেড়েছে ৮৫ কোটি ডলার। মার্কিন শুল্কনীতির কারণে বাংলাদেশের মার্কেট শেয়ার জুনে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত বছরের ৯.২৬ শতাংশের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
রফতানিতে বাড়তি ক্রয়াদেশ
গত দুই সপ্তাহে মার্কিন ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি ক্রয়াদেশের চাপ লক্ষ্য করা গেছে। স্থগিত অর্ডারও ফেরত আসতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, স্প্যারো গ্রুপ আগামী বসন্ত ও গ্রীষ্মের জন্য ৫-১৫% বাড়তি অর্ডার পেয়েছে। স্নোটেক্স গ্রুপ এক ক্রেতার ৭ লাইনের জ্যাকেট উৎপাদন এবার ১৭ লাইনে সম্প্রসারণ করতে যাচ্ছে।
চীনা বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ
চীনা বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। মিরসরাই বেপজা অঞ্চলে হান্ডা গার্মেন্টস ৪ কোটি ডলারের বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করবে। খাইশি গ্রুপও ৪ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩৪টি চীনা বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, যার মধ্যে আটটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোগ
রাজশাহীর বরেন্দ্র টেক্সটাইল লিমিটেড দীর্ঘ ২২ বছর পর পুনরায় চালু হয়েছে, যা ছয় মাসে প্রায় দুই হাজার শ্রমিককে কর্মসংস্থান দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরও ১০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে।
চীনের হারানো ক্রয়াদেশে বাংলাদেশের লাভ
চীনের মার্কেট শেয়ার প্রথমার্ধে ১৮.৮৮% এ নেমেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম ৭৭৭ কোটি ডলার রফতানি করেছে এবং বাংলাদেশের মার্কেট শেয়ার বেড়ে ১০% হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন শুল্কনীতির কারণে চীনের অর্ডার স্থানান্তরিত হয়ে আসছে।
শিল্পে চ্যালেঞ্জ
তবে সমস্যাও আছে। মধ্য ও নিম্নমানের বহু কারখানা বন্ধের পথে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, ঋণখেলাপি, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিই প্রধান চ্যালেঞ্জ। গত এক বছরে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। নতুন গ্যাস সংযোগ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খরচ ৮-১০% বাড়ছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতি প্রয়োজনীয়তা
চীন থেকে সরানো অর্ডার, মার্কিন ক্রেতার বাড়তি চাহিদা, চীনা বিনিয়োগ এবং সরকারী নীতি সমন্বয়—এসব মিলিত হলে বাংলাদেশ ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি অর্জন করতে পারবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন খরচ কমানো, শ্রমিক দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, ব্যাংকিং সুবিধা ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও সামাজিক প্রভাব
বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। মার্কিন শুল্কের ফলে চীনের হারানো ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। রফতানি বৃদ্ধির ফলে নারী কর্মসংস্থান ও ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ীর অংশগ্রহণও বাড়ছে।
উপসংহার
মার্কিন পাল্টা শুল্ক ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। তবে স্থায়ী উন্নতির জন্য উৎপাদন খরচ কমানো, শ্রমিক দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, ব্যাংকিং সুবিধা ও নীতি সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি নীতি, বাণিজ্যিক উদ্যোগ, শ্রমিক ও বিনিয়োগকারীর সমন্বয় ঠিক থাকলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক বাজারে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে।


No comments