Header Ads

বেকারত্বের ছায়ায় বাড়ছে অপরাধ

                                                  

বেকারত্বের ছায়ায় বাড়ছে অপরাধ


                                  

শিল্পনগরী গাজীপুরে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বেকার হওয়া শ্রমিকরা। পুলিশ জানায়, তাঁদের অনেকেই চুরি, ছিনতাই ও প্রতারণাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। গত ছয় মাসে গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আট শতাধিকই বন্ধ হয়ে যাওয়া গার্মেন্ট ও অন্যান্য কারখানার বেকার শ্রমিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব নিরসন, যুবসমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তাঁদের মতে, সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে গাজীপুরসহ অপরাধপ্রবণ এলাকায় অপরাধ কমবে, ফিরবে জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা।

গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি) সূত্র জানায়, সম্প্রতি অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এলাকাটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের ইন্ধন দেওয়ার তথ্যও পাচ্ছে পুলিশ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু গত এক বছরেই গাজীপুরে ৭২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে প্রায় ৭৩ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। গত বছরের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে চলতি বছরের ২৯ জুলাই পর্যন্ত এসব কারখানা বন্ধ হয়। এর মধ্যে গত ছয় মাসেই বন্ধ হয়েছে ২৯টি। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকোর ১৩টি ইউনিট, মাহমুদ জিন্স, ডার্ড কম্পোজিট, পলিকন লিমিটেড, টেক্সটিল ফ্যাশন, ক্লাসিক ফ্যাশন, লা-মুনি অ্যাপারেলসসহ বিজিএমইএভুক্ত আরও ২০টি প্রতিষ্ঠান।

বেকারদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন, আবার অনেকে অপরাধে জড়াচ্ছেন। জিএমপি কমিশনার নাজমুল করিম খান কালের কণ্ঠকে জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ছিনতাইকারীদের ৫০ শতাংশই বেকার। তিনি বলেন, “আমরা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাচ্ছি, কিন্তু পুলিশের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়—জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

গাজীপুর মহানগর পুলিশের লোকবল ও সরঞ্জাম স্বল্পতাও অপরাধ দমনে বড় বাধা বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে সব এলাকায় কার্যকর নজরদারি এবং অপরাধ প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়েছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “বেকারদের আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে, নইলে অপরাধ বাড়তেই থাকবে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় গাজীপুরে মাদক কারবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন জানান, মাদকাসক্ত টোকাই গ্রুপের কারণে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। মাত্র ৫০০ টাকায় তারা এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করে, যা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে গাজীপুর ছেড়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেছেন।

একজন সংগীতশিল্পী জানান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ থাকায় তিনি গাজীপুরের বাড়ি ভাড়া দিয়ে ঢাকায় উঠেছেন। তাঁর মতে, প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা ঘটলেও অপরাধীরা পরে ছাড়া পেয়ে আবার অপরাধে ফিরে আসে, ফলে মানুষ প্রতিবাদে সাহস পায় না। ২০১৯ সালে লিয়াকত হোসেন নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হলেও জড়িতদের শাস্তির খবর পাওয়া যায়নি।

শিল্প এলাকা হওয়ায় গাজীপুরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ বসবাস করে। জনসংখ্যার তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য স্বল্পতা এবং ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় অপরাধের বিস্তার সহজ হয়ে পড়েছে। এর প্রমাণ মিলেছে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি অন্য জেলায়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গাজীপুর জেলা ও মহানগরে ১০৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—এর মধ্যে মহানগরে ৪১টি এবং জেলার পাঁচ থানায় ৬০টি মামলা হয়েছে। এই তথ্যই জেলার আইন-শৃঙ্খলার অবনতির স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, গাজীপুরে অপরাধ বৃদ্ধির কারণগুলো পরস্পর সম্পর্কিত, যা একটি জটিল সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সমাধান সম্ভব নয়; মানবিক সমাজ গঠনে সমাজের সবাইকে আরও সোচ্চার হতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.