Header Ads

আফগানিস্তানকে ঘিরে কেন এত টানাটানি চীন, ভারত ও পাকিস্তানের?


                                         

আফগানিস্তানকে ঘিরে কেন এত টানাটানি চীন, ভারত ও পাকিস্তানের?



 আফগানিস্তান ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে বহুদিন ধরেই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই দেশটি ইতিহাসে বারবার পরাশক্তির দ্বন্দ্বে ব্যবহৃত হয়েছে। একসময় ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের প্রতিযোগিতা, পরে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ঠান্ডা যুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই আফগানিস্তান ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু।

২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে দেশটিকে ঘিরে প্রতিবেশী দেশগুলো—চীন, ভারত, পাকিস্তান ও ইরান—নতুন করে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও প্রায় মৃতপ্রায় আফগানিস্তানকে ঘিরে এত আগ্রহের কারণ কী?


১. ভৌগোলিক অবস্থান: সবার জন্য কৌশলগত সম্পদ

আফগানিস্তান দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মিলনস্থল। পাকিস্তানের সীমান্ত ঘেঁষা এই দেশটির সঙ্গে চীনের শিনজিয়াং প্রদেশও সংযুক্ত। ভারত সরাসরি সীমান্ত ভাগ না করলেও পাকিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের জন্য আফগানিস্তানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

  • চীনের জন্য: আফগানিস্তান মধ্য এশিয়ার জ্বালানি সম্পদের প্রবেশদ্বার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর জন্য অপরিহার্য।

  • পাকিস্তানের জন্য: আফগানিস্তান তার পশ্চিম সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কাবুলে কোন সরকার ক্ষমতায় থাকবে, তা ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

  • ভারতের জন্য: আফগানিস্তান পাকিস্তানকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত পাল্টা ভারসাম্যের অংশ। কাবুলে ভারতের উপস্থিতি ইসলামাবাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।


২. নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী ইস্যু

আফগানিস্তান বহুদিন ধরে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গি সংগঠন ও মাদক পাচারের জন্য পরিচিত। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর এ উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

  • চীনের দুশ্চিন্তা: শিনজিয়াংয়ের উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে। আশঙ্কা রয়েছে, আফগানিস্তান আবারও জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় হলে ETIM-এর মতো সংগঠন চীনে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

  • পাকিস্তানের সমস্যা: আফগানিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর হামলায় বহুদিন ধরে ভুগছে। ইসলামাবাদ চায় তালেবান এদের দমন করুক।

  • ভারতের উদ্বেগ: আল কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট খোরাসান (আইএস-কে) নিয়ে। আশঙ্কা, এদের তৎপরতা কাশ্মীরসহ ভারতের ভেতরে জঙ্গি কার্যকলাপ বাড়াতে পারে।


৩. অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও প্রাকৃতিক সম্পদ

আফগানিস্তানকে বলা হয় "অব্যবহৃত খনিজ ভাণ্ডার"। যুক্তরাষ্ট্রের জরিপ অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে লিথিয়াম, তামা, লোহা, স্বর্ণসহ বহু বিরল ধাতু আছে, যা আধুনিক প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক শিল্পের জন্য অপরিহার্য।

  • চীন: বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেয়ার আর্থ ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদে চীন আগ্রহী। ইতোমধ্যেই তালেবান সরকারের সঙ্গে চীন বিনিয়োগ চুক্তি করেছে।

  • ভারত: গত দুই দশকে আফগানিস্তানে অবকাঠামো, সড়ক, হাসপাতাল, বাঁধ ও সংসদ ভবন নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও ভবিষ্যতের খনিজ সম্পদে অংশীদার হওয়া।

  • পাকিস্তান: মূলত ট্রানজিট সুবিধা ও বাণিজ্য রুটে প্রবেশের স্বার্থে আফগানিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশ পাকিস্তানের বড় অর্থনৈতিক সুযোগ।


৪. রাজনৈতিক প্রভাব ও কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা

আফগানিস্তানকে ঘিরে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আরও তীব্র।

  • চীন: তালেবান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ার প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি। লক্ষ্য—আফগানিস্তানকে পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত করে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক পরিসরে টেনে আনা।

  • ভারত: তালেবানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে কাবুলে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ভারতের উদ্দেশ্য—পাকিস্তানের একচেটিয়া প্রভাব রোধ করা।

  • পাকিস্তান: ঐতিহাসিকভাবে তালেবানের ঘনিষ্ঠ হলেও এখন সম্পর্ক জটিল। ইসলামাবাদ চায় তালেবান তার নিরাপত্তা উদ্বেগ সমাধান করুক, কিন্তু কাবুল সবসময় সে দাবি মানছে না।


৫. আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

আফগানিস্তান অস্থিতিশীল থাকলে এর প্রভাব শুধু দেশটির ভেতরে নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় পড়ে। উদ্বাস্তু সমস্যা, মাদক পাচার, চোরাচালান ও অস্ত্র ব্যবসা—সবই প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি। তাই চীন, ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের স্বার্থে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।


উপসংহার

আফগানিস্তান আজ এক দাবার ছকের মতো, যেখানে চীন, ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের স্বার্থে চাল দিচ্ছে। কারও লক্ষ্য খনিজ সম্পদ, কারও নিরাপত্তা, আবার কারও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আফগানিস্তানকে ঘিরে প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, দেশটি ততই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে এই প্রতিযোগিতা শুধু দেশটির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

No comments

Powered by Blogger.