জনগণের ইচ্ছাতেই সরকার প্রধানের পদে এসেছি, ব্যক্তিগত কারণে নয়: অধ্যাপক ইউনূস
নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর এই বয়সে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে সরে গিয়ে শান্ত অবসরজীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি এখন দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। তাঁর হাতে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটিকে তিনি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং জনগণের প্রতি কর্তব্য হিসেবেই দেখছেন।
বর্তমানে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সরকারের প্রধান হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়; বরং এটি জনগণের দাবির প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়,
“এটা আমার জন্য নয়, এটা তাঁদের জন্য—যাঁরা পরিবর্তন চেয়েছেন। তাঁরা যেভাবে এগোতে চান, আমি কেবল তাঁদের সহায়তা করছি।”
মালয়েশিয়ায় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে জাতীয় সংবাদমাধ্যম বারনামা–কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নেন বারনামার প্রধান সম্পাদক আরুল রাজু দুরার রাজ। এ সময় ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সার্ভিসের সম্পাদক ভুন মিয়াও পিং এবং বারনামার ইকোনমিক নিউজ সার্ভিসের সহকারী সম্পাদক কিশো কুমারী সুশেদারামও উপস্থিত ছিলেন।
ক্ষুদ্রঋণ ধারণার পথিকৃৎ হিসেবে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি পাওয়া অধ্যাপক ইউনূস কখনোই রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে বসার পরিকল্পনা করেননি। তাঁর ভাষায়, পরিস্থিতিই তাঁকে এমন এক অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে, যেখানে পছন্দ করার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।
তিনি স্বীকার করেন, সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবারও অস্থিতিশীলতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্য,
“এখানে অসুবিধা অনেক। অনেকে এটিকে ব্যাহত করতে চায়। কারণ, বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত রাজনৈতিক উপাদানগুলো পুরো ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।”
অধ্যাপক ইউনূস একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অভিভাবক হিসেবে নিজের ভূমিকা তুলে ধরতে চান। বিশেষ করে নতুন ভোটারদের প্রতি তিনি আলাদা গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষায়,
“ভাবুন, আপনার বয়স ১৮ হয়েছে, আপনি ভোট দিতে চান। কিন্তু কখনোই সুযোগ পাননি। কারণ, প্রকৃত অর্থে কোনো নির্বাচনই হয়নি। এখন তাঁরা ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।”
বাংলাদেশে গত দেড় দশকে বহু তরুণ নতুন ভোটার হয়েছেন, যাঁদের কেউ আগে কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাঁদের জন্যই আসন্ন নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। এর পর ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তা অধ্যাপক ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন।
তবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও কয়েক দশক আগে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ে। তখন তিনি ৪২টি পরিবারকে মাত্র ২৭ ডলার ব্যক্তিগত ঋণ দেন, যাতে তাঁরা উচ্চ সুদের বোঝা ছাড়াই বিক্রির জন্য পণ্য উৎপাদন করতে পারেন। এই অভিজ্ঞতা থেকেই ক্ষুদ্রঋণ ধারণার জন্ম হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামে গবেষণাধর্মী একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংক–এর সূচনা হয়। ১৯৮৩ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকে রূপ নেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষমতায়ন।
গ্রামীণ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি মোট ৪০,৩৬৮.৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছে ১০.৭২ মিলিয়ন (১ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার) গ্রহীতাকে। সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশই নারী।


No comments