বাংলাদেশ–ভারত বাণিজ্য উত্তেজনার প্রভাব কী পড়ছে?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বহু বছর ধরে উভয় দেশের অর্থনীতি ও জনগণের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে স্থলবন্দর দিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি–আমদানিতে ভারতের একতরফা নিষেধাজ্ঞা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। এই বাধা কেবল ব্যবসায়িক লেনদেনকে নয়, বরং কৃষক, শ্রমিক ও রপ্তানিকারকদের জীবন ও আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, যাতে বোঝা যায় এই বাণিজ্য উত্তেজনা দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি খাত এবং সাধারণ জনগণের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে।
১. ভারতের নতুন নিষেধাজ্ঞা
ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য স্থলপথে আমদানির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ভারতের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এখন থেকে এসব পণ্য কোনো স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না, বরং শুধু মহারাষ্ট্রের নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে হবে।
এর আগে গত কয়েক মাসে ভারত একাধিক অশুল্ক বিধিনিষেধ চালু করেছে। এপ্রিল মাসে কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশি পণ্য পাঠানোর সুবিধা বাতিল করা হয়। এরপর মে মাসে স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, আসবাব, সুতা, ফলমূল ও পানীয় আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জুনে আবার ৯ ধরনের পণ্যের ওপর নতুন নিয়ম চালু হয়, যার মধ্যে কাঁচা পাট, পাটের সুতা ও বিশেষ কাপড় ছিল।
বাংলাদেশও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ৮৫৫.২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। ভারতের বাজার এ খাতের জন্য সবচেয়ে বড় গন্তব্য এবং বেশিরভাগ রপ্তানি হয় বেনাপোল, হিলি, বুড়িমারী ও সোনামসজিদ সীমান্ত দিয়ে। ফলে এই নতুন সিদ্ধান্ত রপ্তানিকারকদের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২. ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও বর্তমান সংকট
বাংলাদেশ ও ভারতের ৪,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভাষাগত বন্ধন দুই দেশকে ঘনিষ্ঠ করেছে। স্বাধীনতার পর ভারত শুধু রাজনৈতিক সমর্থক নয়, বরং অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
গত দুই দশকে এই সম্পর্ক রাজনীতি ছাড়িয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং অবকাঠামোগত সংযোগে প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। সহযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও অবিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে। বাণিজ্য কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এটি পারস্পরিক আস্থা ও কূটনীতির প্রতিফলন। ফলে বাণিজ্যে বাধা তৈরি হলে কেবল দুই দেশের সম্পর্ক নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভারতের একতরফা অশুল্ক বাধা এই আস্থাকে দুর্বল করছে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
৩. বাংলাদেশের পাটখাতের গুরুত্ব
বাংলাদেশের পাট খাত একসময় দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস ছিল। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছিল পাট থেকে। যদিও বর্তমানে পোশাক খাত সেই জায়গা দখল করেছে, তবুও পাট এখনও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। এটি মোট রপ্তানির প্রায় ৩ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ জোগান দেয়।
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি পাট চাষের জন্য অনুকূল। হাজার হাজার কৃষক ও শ্রমিক এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। ভারতে রপ্তানির ৯৯ শতাংশই স্থলবন্দর দিয়ে যেত। এখন এসব পণ্য সমুদ্রপথে নিতে হলে খরচ ও সময় কয়েকগুণ বাড়বে। আগে যেখানে দুই–তিন দিনে পণ্য পৌঁছানো যেত, সেখানে সমুদ্রপথে ছয়–আট সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা শুধু কৃষক ও শ্রমিক নয়, রপ্তানিকারকদের জন্যও অনিশ্চয়তা ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
৪. দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অগ্রগতি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭২ সালের বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে সীমান্ত হাট, ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের মতো সুবিধা যুক্ত হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও যৌথ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ভারত ২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে, বিশেষ করে পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রে। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতের ডিউটি ফ্রি ট্যারিফ প্রেফারেন্স (DFTP) স্কিমের আওতায় বাণিজ্য করছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ সহযোগিতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০১৩ সালে বিদ্যুৎ গ্রিড যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। খুলনার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র দুই দেশের যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত। সম্প্রতি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্য শুরু হয়েছে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি বড় দৃষ্টান্ত।
৫. উপসংহার
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক এখন এক জটিল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও নীতিগত পদক্ষেপ আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
বাংলাদেশও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে আকার ও প্রভাবের দিক থেকে ভারতের দায়িত্ব অনেক বেশি। কারণ এই সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়—সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও যুক্ত।
টেকসই সম্পর্কের জন্য কঠোর বাণিজ্যনীতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কূটনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা। যদি দুই দেশ আস্থাভিত্তিক সহযোগিতার পথ বেছে নেয়, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অগ্রগতির অনন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।


No comments