জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ: সারজিস
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও সমাজের প্রতি দায়বোধের এক সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ—এমন মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম।
বুধবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল ছাত্রসমাজের অন্তর্গত চেতনার বিস্ফোরণ। কোটা সংস্কার বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। বরং এটি ছিল জনগণের ক্ষোভ ও দায়িত্ববোধের ফল।
তিনি বলেন, আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তে কেবল ছাত্রসমাজ নয়, সাধারণ মানুষও জেগে উঠেছিল নতুন এক চেতনায়। সে সময় মনে হয়েছিল, যদি ছাত্ররা নেতৃত্ব না নেয়, তাহলে জাতি আরও পিছিয়ে পড়বে। আমরা রাজপথে ছিলাম, পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণেও সক্রিয় ছিলাম। প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছি—কীভাবে সেগুলো বৈষম্যমূলক হতে পারে। তখন উপলব্ধি করি, আমরা যদি চুপ থাকি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের কোনো জবাব থাকবে না।
সারজিস বলেন, এই দায়বোধ থেকেই আমরা রাজপথে নামি। আমাদের কারো কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। আমরা ক্যারিয়ার বা সুবিধার জন্য নামিনি। বরং আমরা জানতাম, নামলে হয়তো গ্রেফতার, নিখোঁজ অথবা পারিবারিক বিপর্যয়ের শিকার হতে পারি। তবুও মনে হয়েছিল, এ দেশটা তো আমাদেরও, তাই এ দেশের ন্যায্যতার প্রশ্নে যদি ছাত্রসমাজ না দাঁড়ায়, তাহলে আর কে দাঁড়াবে?
তিনি আরও বলেন, আমরা নেতৃত্ব নিতে নয়, আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল কোনো একক নেতার ওপর নির্ভর না করে, সমন্বিত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী ছাত্র আন্দোলনের ভিত রচনা করা।
তরুণ এই নেতা বিশ্বাস করেন, প্রকৃত পরিবর্তন আসে সংগঠিত জনতার ঐক্য থেকে—যেখানে সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করে, এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক নায়কের বদলে সামনে আসে সমষ্টিগত শক্তি।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতনে রূপ নেয়। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন কয়েকজন সাহসী তরুণ নেতা, যাদের মধ্যে অন্যতম সারজিস আলম।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী থেকে উঠে আসা সারজিস ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হল থেকে ডাকসু প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। তবে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির প্রতি হতাশ হয়ে তিনি ২০২২ সালে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করেন।
২০২৪ সালে তিনি 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন'-এর অন্যতম সংগঠক হিসেবে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় হন, যা দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি গণআন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের সময় তিনি গ্রেফতার, নির্যাতন এবং রাজপথে সংঘর্ষের মুখেও পিছিয়ে যাননি।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পরও সারজিস স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমাদের লক্ষ্য পূর্ণ হয়নি, আমরা ফ্যাসিবাদের স্থায়ী অবসান চাই।" এই বক্তব্যেই তার আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্দোলনের পর তিনি 'জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন'-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে 'জাতীয় নাগরিক কমিটি’র প্রধান সংগঠক হিসেবে যুক্ত হন। সর্বশেষ, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পান তিনি।
রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পথে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নতুন ধারার রাজনীতিতে সারজিস আলম এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।


No comments