Header Ads

নতুন যাত্রাপথে কঠিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

 
                                         

নতুন যাত্রাপথে কঠিন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ




নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুকে ঘিরে কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সপ্তাহটি দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বিন্দু বা ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা দিতে পারে। কারণ, আগামী সপ্তাহেই ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে, যেদিন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছিল। পাশাপাশি, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তিও সামনে।

এই প্রেক্ষাপটে, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের গড়া নতুন রাজনৈতিক দল—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—৫ আগস্টের আগেই ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা করার জন্য চাপের মুখে রয়েছে। একই সময়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে বলেও আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন ও কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি ইতিবাচক সমঝোতা তৈরি হয়, তবে তা হতে পারে একটি স্থায়ী সমাধানের সূচনা। অন্যদিকে, ঐক্য না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকার সংকট এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

এনসিপি আগামী ৩ আগস্ট ঢাকায় একটি বৃহৎ সমাবেশের ডাক দিয়েছে, যা নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এই সমাবেশে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘোষণা আসতে পারে। এ ছাড়াও, নির্বাচন আয়োজন, সাংবিধানিক সংস্কার, ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিরোধ—এসব বিষয় সামনে আসছে। একাধিক দল ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন দাবি করলেও, জামায়াত ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল বলছে, আগে সংস্কার, জুলাই সনদ ঘোষণা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করতে হবে।

গত শনিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার জানান, আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে নির্বাচন তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে। তার এই মন্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ইতোমধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর একটি খসড়া দলগুলোর কাছে হস্তান্তর করেছে। আগামীকালের মধ্যে এই খসড়া নিয়ে মতামত দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া, গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী ও কূটনৈতিক মহলের নজর এখন রাজধানীর হেয়ার রোডে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র দিকে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। শুরু থেকেই সরকার বলছিল, সংস্কার শেষে যৌক্তিক সময়ের মধ্যেই নির্বাচন হবে। প্রথমে বলা হয়েছিল, ২০২4 সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। পরে ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচন হতে পারে। তবে বিএনপি ও তার মিত্রদলগুলো এই দীর্ঘ সময় মেনে নিতে পারেনি। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে পারে। তবে এখনো নির্দিষ্ট দিন-তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় অসন্তোষ রয়ে গেছে।

বিএনপি ও তার মিত্রদলগুলো চায় ২০২৪ সালের মধ্যেই নির্বাচন হোক। অন্যদিকে, জামায়াত চায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হোক। এনসিপি চায় প্রথমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এরপর জাতীয় নির্বাচন ও গণপরিষদ নির্বাচন হোক।

সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমে ছয়টি এবং পরে পাঁচটি কমিশন গঠন করে। এগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে একটি সাত সদস্যের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে আছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। এই কমিশন নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, সংবিধান ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত সংস্কার বিষয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

গতকালও কমিশনে সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, অভ্যুত্থান, আন্দোলন ও জনতাকে কেন্দ্র করে যে ঐক্যমতের ভিত্তিতে এই সনদ তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হবে। সনদে সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন, প্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সনদ গৃহীত হওয়ার পর নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারকে দুই বছরের মধ্যে এই সংস্কার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা যদি নিজেদের মধ্যে বিভক্ত থাকি, তবে তা ফ্যাসিবাদীদের পুনরায় উত্থানের সুযোগ করে দেবে। তিনি জানান, বিএনপি সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চায়।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্য সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তিনি বলেন, আগে গণহত্যার বিচার, তারপর সংস্কার ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন জরুরি।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এক বছরে কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে, তা এখন পর্যালোচনার সময়। তিনি আশা করেন, ৫ বা ৮ আগস্টের মধ্যে সরকার নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে পরিষ্কার বার্তা দেবে।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, ফ্যাসিবাদ পতনের বর্ষপূর্তিতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এবং জুলাই সনদ স্বাক্ষর একটি নতুন যাত্রার সূচনা হবে।

এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, নির্বাচনের অনিশ্চয়তা এখনো কেটে না যাওয়ায় মানুষ হতাশ। তিনি বলেন, দ্রুত নির্বাচনের রূপরেখা না দিলে সংকট আরও গভীর হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির বিশেষ সহকারী বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু বলেন, এখন জরুরি হচ্ছে একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ। এই পথই একমাত্র শান্তিপূর্ণ সমাধান দিতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এই সময়েই দেশের তরুণ সমাজের নেতৃত্বে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তিনি বলেন, এখন রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে দুটি বিষয় ঘিরে—নির্বাচনের তারিখ ও জুলাই সনদ। এই দুটি বিষয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা-ই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা।

No comments

Powered by Blogger.