Header Ads

দুয়ার কেলেঙ্কারিতে অগ্রণী ব্যাংকের বড় ধরনের ক্ষতি

               

দুয়ার কেলেঙ্কারিতে অগ্রণী ব্যাংকের বড় ধরনের ক্ষতি


            

অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের পুরো নিয়ন্ত্রণ তৃতীয় পক্ষের হাতে চলে গেছে। ‘দুয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখাও বড় ধরনের লোকসান ভোগ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নেওয়ার আগেই অগ্রণী ব্যাংক ‘দুয়ার’ নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানটি সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিবারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দুয়ার ও সংশ্লিষ্টদের সুবিধা দিয়েছে, যার ফলে ব্যাংক বড় লোকসানে পড়েছে। বর্তমানে নতুন বোর্ড দুয়ারের সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিং চুক্তি বাতিল করেছে। এসব তথ্য অগ্রণী ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে দুয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড সরাসরি লাভবান হয়েছে, আর সরকারি ব্যাংক অগ্রণী কমপক্ষে আড়াইশ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে অনুমোদনের আগেই দুয়ারের সঙ্গে চুক্তি, তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার ব্যবহার, অতিরিক্ত বিল পরিশোধসহ নানা অনিয়ম করা হয়। এসব তথ্য ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে। দুয়ার চুক্তির মেয়াদ নবায়নের জন্য আগ্রহী ছিল, কিন্তু অগ্রণী ব্যাংক শর্ত আরোপ করলে তারা তা মানতে রাজি হয়নি। এর ফলে ২০২৫ সালের ২০ জুন থেকে দুয়ারের সব কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।

২০১৩ সালে অগ্রণী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করলেও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায় ২০১৫ সালের ২৬ অক্টোবর। অনুমোদনের আগের বছর মে মাসে দুয়ারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা লঙ্ঘন। তৎকালীন কর্তৃপক্ষ অনুমোদনপত্র তিন বছর গোপন রাখে এবং ২০১৮ সালে তা প্রকাশ পায়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বোর্ডের বৈঠকে অনুমোদনপত্র লঙ্ঘনের বিষয়ে আলোচনা হলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং দুয়ারকে আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ বা সত্য গোপনের চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

দুয়ার গত দশ বছরের বেশি সময় অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় ২২৭ কোটি টাকা বিল নিয়েছে, যার মধ্যে সফটওয়্যার ব্যবহারের খরচ ছাড়াও স্টেশনারি, আসবাবপত্র, কম্পিউটার সরঞ্জাম ও এজেন্ট পয়েন্ট স্থাপনায় বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ৫৬৭ জন কাস্টমার সার্ভিস প্রোভাইডার (সিএসপি) স্থাপনের জন্য দুয়ারকে এককালীন ৯০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি সেবার জন্য মাসে কখনো ৫৩ লাখ, কখনো ৩৪ লাখ, এবং সফটওয়্যার সাপোর্ট বাবদ ১৩ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। এসব ব্যয় চুক্তিতে নির্ধারিত ছিল না এবং হিসাববহির্ভূত ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের নিজস্ব সফটওয়্যার ছাড়া তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার ব্যবহার অনুমোদিত নয়। কিন্তু অগ্রণী ব্যাংক ‘সেলোস্কোপ’ নামে দুয়ারের মালিকানাধীন সফটওয়্যার ব্যবহার করেছে, যার জন্য প্রতি মাসে ১ কোটি ১ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থাপনা ব্যাংকের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে তৃতীয় পক্ষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকলেও, অগ্রণী ব্যাংক সেটি উপেক্ষা করে দুয়ারকে প্রবেশাধিকার দিয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কঠোর আপত্তি জানায় এবং দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। এছাড়া, ব্যাংকের ভাড়া করা ভবনে স্থাপিত ডাটা সেন্টারের জন্য দুয়ারকে প্রতি মাসে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা ভাড়া বাবদ দেয়া হয়েছে, যা বেআইনি।

অভ্যন্তরীণ তদন্তে জানা যায়, অগ্রণী ব্যাংকের কিছু প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তা দুয়ারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকের শাখাগুলোতে বড় ধরনের লোকসান সৃষ্টি করেছেন। তারা পার্শ্ববর্তী শাখার লেনদেন ইচ্ছাকৃতভাবে এজেন্ট পয়েন্টে স্থানান্তর করতেন যাতে শাখাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দুয়ারের এজেন্ট পয়েন্ট থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকা গ্রাহক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে ধরা পড়েছে। ২০২৫ সালের ১৯ জুন মেয়াদোত্তীর্ণ চুক্তি নবায়নের আগে ব্যাংক কিছু শর্ত দিয়েছিল, যা দুয়ার মেনে নেয়নি। ফলে ৫৬৭টি এজেন্ট পয়েন্ট বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ২২ জুন থেকে কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ব্যাংক জানিয়েছে, গ্রাহকরা আগের মতো যে কোনো শাখা থেকে সেবা নিতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২১ ও ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দুয়ারকে দেওয়া অতিরিক্ত সুবিধা ও চুক্তিবহির্ভূত অর্থ প্রদানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তা সময়মতো পাওয়া যায়নি। ব্যাংক একটি স্বতন্ত্র নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিযোগ করেছে, এখনো ব্যয়, অতিরিক্ত অর্থ প্রদান ও তৃতীয় পক্ষের ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। নতুন বোর্ড নিরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে দুয়ারকে শর্ত দিয়েছিল, কিন্তু তা অনুসরণ করেনি।

অগ্রণী ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করেছে এবং শিগগিরই নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করবে, যাতে ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতা থাকবে না।

দুয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘আগের বোর্ড আমলে দুয়ার নানা অনিয়মে জড়িয়েছে যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। আমরা তাদের কিছু শর্ত দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা মেনে নেয়নি। তাই চুক্তি নবায়ন করা হয়নি।’

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম কালবেলা বলেন, ‘দুয়ারের অনেক এজেন্টই ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা। তাদের প্রভাবের কারণে ব্যাংকের শাখাগুলো বড় ক্ষতির মধ্যে পড়ে। এজন্য আমরা নতুন শর্ত দিয়েছি, যা তারা মেনে নেয়নি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান কালবেলা বলেন, ‘দুয়ারের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত অগ্রণী ব্যাংকের নিজস্ব। ব্যাংক দুয়ার থেকে যে সেবা নিয়েছিল, তা আইন সম্মত ছিল না। তবে আশা করি ব্যাংক নিজস্ব সক্ষমতায় এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সফলভাবে চালাতে পারবে।

No comments

Powered by Blogger.