Header Ads

বিএনপি বনাম জামায়াত-চরমোনাই-এনসিপি: দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?

 
                   
                                         

বিএনপি বনাম জামায়াত-চরমোনাই-এনসিপি: দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?



ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনীতির মাঠে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে একসঙ্গে থাকা দলগুলোর মধ্যে এখন দ্বন্দ্ব ও বিভাজন দেখা দিয়েছে। একদিকে রয়েছে বিএনপি, আর অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুই শিবিরের মধ্যে স্লোগান ও বক্তব্যের মাধ্যমে চলছে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বক্তব্য ও স্লোগান রাজনৈতিক শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও ক্ষমতার রাজনীতিকে ঘিরেই এই উত্তেজনা বাড়ছে।

নির্বাচনের আগে বিএনপির বিপরীতে একটি নির্বাচনী জোট গঠনের প্রচেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে থাকা দলগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কেউ কেউ দুই শিবিরের সঙ্গেই গোপনে যোগাযোগ রাখছে বলেও জানা গেছে। ফলে বিভেদের সুযোগে ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনঃউত্থানের আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক নেতারা।

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ১৬ ও ১৭ জুলাই কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শেষে তাঁর প্রেস উইং জানায়, ইউনূস বলেন, “পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্রের লক্ষণ এক বছর যেতে না যেতেই প্রকাশ পাচ্ছে।” তাই ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য আরও দৃশ্যমান করার আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সংস্কারকেন্দ্রিক নানা বিষয়ে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপির মতভেদ রয়েছে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের দাবি, নির্বাচন নয়, আগে সংস্কার। বিএনপি বলছে, জরুরি সংস্কার শেষ করে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। বিএনপির ধারণা, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বিলম্বিত করতে চায়।

এই মতপার্থক্যের ফলে ইতোমধ্যেই বিএনপি ও অন্য তিন দলের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়েছে। ৯ জুলাই পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যাকাণ্ডের পর এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে আসে। দুই পক্ষই একে অন্যকে আক্রমণ করে বক্তব্য ও স্লোগান দেয়, যা শালীনতার সীমা ছাড়ায়।

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নেতা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম ৯ জুলাই সাংবাদিকদের বলেন, “বিএনপির কী গুণ, ৯ মাসে দেড় শ খুন। চাঁদা তুলে পল্টনে, চলে যায় লন্ডনে।” এর আগে তিনি বলেছিলেন, “আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক গাছের দুই ডাল।”

১১ জুলাই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ভাইরাল হলে দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানিয়েছে।” তিনি যুবদলকে দায়ী করে বলেন, “চাঁদা না পেয়ে তারা খুন করেছে।” এরপর বিএনপি সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়।

ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রদের ব্যানারে রাতের মিছিল হয়। এসব মিছিলে তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে “যুবদল খুন করে, তারেক রহমান কী করে”—এমন অশালীন স্লোগান দেওয়া হয়। বিএনপির ধারণা, এসবের পেছনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রয়েছে।

বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল ১৩ জুলাই বলেন, “কিছু দল পরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে টার্গেট করছে।” পাল্টা স্লোগানও আসে বিএনপির পক্ষ থেকে, যেমন “দিল্লি গেছে স্বৈরাচার, পিণ্ডি যাবে রাজাকার।” চরমোনাই পীরকে নিয়েও অশালীন মন্তব্য ছড়ায়।

১৪ জুলাই বিএনপির সমাবেশে মির্জা আব্বাস বলেন, “লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের দায় বিএনপির ওপর চাপানোর ষড়যন্ত্র চলছে।” তিনি জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপিকে এর জন্য দায়ী করেন। চরমোনাই পীরকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি ধর্মীয়ভাবে কোথা থেকে পাস করেছেন?” জামায়াত সম্পর্কে বলেন, “নিজে চলতে পারে না, কখনো এরশাদের, কখনো আওয়ামী লীগের সাহায্যে টিকে ছিল।”

১৮ জুলাই তিনি আরও বলেন, “একজন পীর একসময় বলেছিলেন, জামায়াতের ছোঁয়া লাগলে তা পচে যায়। এখন সেই পীর জামায়াতের সঙ্গে আছেন।”

১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের হামলার পর মনে করা হয়েছিল, বাগ্‌বিতণ্ডা কিছুটা কমবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং ২০ জুলাই কক্সবাজারে এনসিপির পথসভায় দলের নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে আক্রমণ করে বলেন, “আগে শামীম ওসমান ছিল নারায়ণগঞ্জে, এখন কক্সবাজারে গডফাদার এসেছে শিলং থেকে।”

এই বক্তব্যের পর চকরিয়ায় বিএনপির কর্মীরা এনসিপির সভামঞ্চ ভাঙচুর করে। এর ফলে দুই পক্ষের বিরোধ আরও বাড়ে। ইসলামী আন্দোলন (২৮ জুন) ও জামায়াত (১৯ জুলাই) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করলেও বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যদিও জামায়াতের আমির অসুস্থ হলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে দেখে আসেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিভেদ নিরসনে তেমন ভূমিকা রাখেনি।

বিএনপির উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম সবাই মিলে প্রতিবাদ করুক, বিভাজন তৈরি হোক—তা চাইনি। কিন্তু এখন বিএনপিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা মীর্জা গালিব বলেন, “আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনৈতিক দলগুলো অনেক দিন পর মতপ্রকাশের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু টোন বেশি চড়া হলে পরিস্থিতি খারাপ দিকে যেতে পারে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মৌলিক সংস্কার নিয়ে মতভিন্নতার কারণে বিএনপি কিছুটা চাপে রয়েছে। অন্যরা বিএনপিকে “সংস্কারবিরোধী” বা “নির্বাচন–অস্থির” হিসেবে প্রচার করতে পেরেছে। যার ফলে দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আক্রমণ বেড়েছে।

বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন রাজনীতিতে একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে কয়েকটি দল—এমন বিভাজন দেখা যাচ্ছে। মতপার্থক্য থাকায় বিএনপি চাপে পড়েছে।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, রাজনীতিকদের দোষ চাপানোর প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। এতে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে এবং জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায়। তিনি প্রত্যাশা করেন, নেতারা দায়িত্বশীল আচরণ ও যথাযথ রাজনৈতিক চর্চা করবেন।

No comments

Powered by Blogger.