Header Ads

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা মেরুদণ্ডহীন

                                                  
                                     

বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা মেরুদণ্ডহীন



দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের তীব্র সমালোচনা করে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মেরুদণ্ড নেই। যাঁর পক্ষে দাঁড়ানো উচিত, নীতির জায়গা থেকে তাঁর পক্ষে দাঁড়ানোই কর্তব্য। সবচেয়ে কঠিন সময়ে নীতির পক্ষে দাঁড়ানোই আসল পরীক্ষা।’’

আজ বুধবার (২৩ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান: এক বছরের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। এই গোলটেবিলের আয়োজন করে প্রথম আলো।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘চিন্ময়ের পক্ষে দাঁড়ালাম, তখন বলা হলো আমি ভারতের দালাল। হেফাজতের পক্ষে দাঁড়ালে বলা হয় আমি জামাতি।’’ তিনি অভিযোগ করেন, যাঁরা আগে গণ–অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন এবং নিজেরাও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার মুখে পড়েছিলেন, তাঁরাই এখন ওই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, যা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হয়েছে।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘‘চিন্ময় দাস রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় অভিযুক্ত। তাঁকে জামিন দেওয়া হয়নি। এমনকি একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। এসব আমরা হতে দিয়েছি। অথচ এই ছেলে (চিন্ময়) সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে কথা বলছিল।’’

তিনি অভিযোগ করেন, গণ–অভ্যুত্থানের পরেও দেশে প্রকৃত পরিবর্তন আসেনি। ‘‘৮ আগস্টের পর শেখ হাসিনার সংবিধানের অধীনেই সব ফিরে গেছে। আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধিজীবী—সবই আগের জায়গায় রয়েছে। কিছুই পাল্টায়নি। আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি যে ৮ আগস্ট একটি সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব ঘটে গেছে।’’

নির্বাচনের বিপক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন নয়, গণ–অভ্যুত্থানই পথ। নির্বাচন মানেই পুরনো লুটেরা মাফিয়া শ্রেণিকে আবার ফিরিয়ে আনা। এনসিপিও এখন সেটাই শিখছে। তারাও বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা চাইছে। দুই কোটি, পাঁচ কোটি টাকার কথা উঠছে।’’

ফরহাদ মজহার বলেন, এনসিপি গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে যাত্রা করেছিল, তাই তাদের প্রতি সমর্থন রয়েছে। কিন্তু এখন তারা ভুল পথে যাচ্ছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, যা তাদের আরও দুর্বল করছে।

বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘সমাজে যারা চিন্তা করতে পারে, তাদের মধ্যে ঐক্য দরকার। কারণ রাষ্ট্র মানেই সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরের প্রতিফলন। রাষ্ট্রের দুর্দশার জন্য আমরাই দায়ী। শুধু সরকারের সমালোচনা করে কোনো লাভ নেই, রাষ্ট্র ও সরকার এক নয়।’’

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য যে লড়াই, তা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে বাঙালি জাতিবাদের নামে ইসলামকে সংস্কৃতি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে ইসলামবিদ্বেষ তৈরি হয়েছে। ইসলাম নির্মূলের রাজনীতি হয়েছে। এটা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের সমাধান করতে হবে। তা না হলে এখানে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বা ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান সেই ভুলগুলো শোধরানোর সুযোগ। বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবের মতোই এখানে জনগণ হাজির হয়েছে। ৫ আগস্টের পরও জনগণ রয়ে গেছে। এটি কোনো আইনের অধীনে নয়। একাত্তরের অর্জন—মানবিকতা, সাম্য ও ইনসাফ—সেগুলো আরও বিস্তৃত করা জরুরি। কিন্তু সেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে ধর্মীয় জাতিবাদ তৈরি হলে, তাও হবে এক ধরনের ফ্যাসিবাদ।’’

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়েও সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘‘মুহাম্মদ ইউনূস এখন জুলাই সনদ দেবেন, লুটেরা শ্রেণির রাজনীতিকদের সঙ্গে বসে। কে তাঁকে এই অধিকার দিয়েছে? তিনি বিপ্লবের মহানায়ক নন, তিনি তো তার ফল। আর এ কারণেই বাংলাদেশ আজ দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে।’’

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। আলোচনায় আরও অংশ নেন—পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান, লেখক ও গবেষক মাহা মীর্জা, তরুণ গবেষক সহুল আহমদ প্রমুখ।

No comments

Powered by Blogger.