গোপালগঞ্জের সহিংসতা: অনুশোচনাহীন আওয়ামী লীগের নতুন রাজনৈতিক চাল?
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাম্প্রতিক পদযাত্রাকে ঘিরে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনা। এই ঘটনাকে ‘ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের ফাঁদ’ হিসেবে অভিহিত করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্রের অংশ।
‘হামলার নীলনকশা আগে থেকেই ছিল’
জুলাই মাসের পূর্বঘোষিত পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা উসকানিমূলক প্রচারণা। বঙ্গবন্ধুর সমাধি ভাঙার মতো অপপ্রচারে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জেরে এনসিপি নেতাকর্মীদের প্রতিহতের ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে। দুর্বৃত্তরা রাতারাতি সশস্ত্র হয়, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাও চোখে পড়ে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্বীকার করেন, গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল। তিনি জানান, গ্রাম থেকে সংঘবদ্ধভাবে শহরে এনে লোকজন হামলায় অংশ নেয়।
‘আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ছিল আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তাদের মতে, গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্রজনতার ওপর চালানো দমনপীড়নের প্রচার আড়াল করতেই এবার গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের নাটক সাজানো হয়েছে। অনেকে বলছেন, সংঘর্ষের ভিডিওকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টাও করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য, পতিত স্বৈরাচারী শক্তি একটি নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পলাতক সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও দলের দোসররা। অনেকে আবার মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করছেন।
অনুশোচনার অভাব ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
আওয়ামী লীগ এখনও জুলাইয়ের ঘটনায় অনুশোচনা প্রকাশ করেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বরং তারা এ ঘটনাকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলেও প্রচার করছে। ভারতে পলাতক অবস্থায় শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, এটি তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর একটি পরিকল্পনার অংশ। দলীয় অন্যান্য নেতারাও একই সুরে কথা বলছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “আওয়ামী লীগের মধ্যে অনুশোচনার কোনো লক্ষণ নেই। তারা প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ ছড়িয়ে দিচ্ছে।”
এনসিপির অবস্থান ও বক্তব্য
এনসিপি নেতারা দাবি করেছেন, তারা আইনগত অনুমোদন নিয়েই গোপালগঞ্জে গিয়েছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। বরং হামলার দায় প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, “আমরা কোনো সহিংসতা বা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সমর্থন করি না। প্রশাসন যদি দায়িত্ব পালন করতো, এ ধরনের পরিস্থিতি হতো না।”
দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, “এনসিপি ভিকটিম। অথচ আমাদেরই দায়ী করা হচ্ছে, যা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’-এর শামিল।”
এনসিপির মুখপাত্র আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “পহেলা জুলাই দেশজুড়ে পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছিলাম। জনতার আগ্রহ দেখে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ আলাদাভাবে ঘোষণা করা হয়। হুমকি সত্ত্বেও আমরা পিছু হটিনি। সফলভাবে কর্মসূচি পালন করেছি।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, পুলিশের কেউ কেউ হামলা প্রতিহত না করে পেছনের দরজা দিয়ে নিরাপদে সরে যান। এ নিয়ে পুলিশ সুপারের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে।
অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “পুলিশ ভয় পেয়ে এখনও সাহস ফিরে পায়নি, তাই সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারছে না।”
পুলিশের ব্যাখ্যা
পুলিশ দাবি করেছে, তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে হামলা ঠেকাতে। শহরে চার শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল, পর্যাপ্ত টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল, যার কারণে হামলার সময় কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
সেনাবাহিনীর সহায়তায় এনসিপি নেতাকর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় বলেও জানায় পুলিশ।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানান, তিনি গোপালগঞ্জে অবস্থান করছেন এবং ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


No comments