Header Ads

কেন ৪০% কৃষক এখনও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত?

           

কেন ৪০% কৃষক এখনও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত?



দেশের জাতীয় কৃষি মজুরির (দৈনিক ৬০০ টাকা) চেয়ে কম মজুরি পান প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষক। বাকি ৬০ শতাংশ কৃষক এই হার সমান অথবা তার চেয়ে বেশি মজুরি পান। কৃষি মজুরির দিক থেকে সিলেট ও খুলনা বিভাগের কৃষকেরা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন, অন্যদিকে ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের কৃষকেরা তুলনামূলকভাবে ভালো মজুরি পান। এসব তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে।

সোমবার (৩০ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ‘উৎপাদনশীল ও টেকসই কৃষি জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এই জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেশে প্রথমবারের মতো ১১টি মানদণ্ডের ভিত্তিতে কৃষি খাত কতটা টেকসই তা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে এই জরিপ পরিচালিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

জরিপে দেখা যায়, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা কম মজুরি পান। শহরাঞ্চলে ৭৬ শতাংশ কৃষক যথাযথ মজুরি পেলেও গ্রামে এই হার মাত্র ৫৯ শতাংশ। বিভাগের ভিত্তিতে দেখা যায়, সিলেট বিভাগের ৬৩ শতাংশ ও খুলনার ৬০ শতাংশ কৃষক যথাযথ মজুরি পান না। তবে ময়মনসিংহে ৭৫ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৭৩ শতাংশ কৃষক যথাযথ মজুরি পান। ঢাকায় এই হার ৬৭ শতাংশ।

কৃষি খাতে লাভের বিষয়ে জরিপে বলা হয়, দেশের ৭৯ শতাংশ কৃষিজমি গত তিন বছরে অন্তত এক বছর লাভজনক ছিল। তবে ২১ শতাংশ জমি কোনো বছরই লাভের মুখ দেখেনি। শহরাঞ্চলে এই হার ২৫ শতাংশ।

জমির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩১ শতাংশ কৃষিজমি কৃষিঋণ, ইনস্যুরেন্স বা একাধিক ফসল ব্যবস্থাপনার আওতার বাইরে রয়েছে। শহরাঞ্চলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ জমির পরিমাণ ৪৪ শতাংশ।

সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক চিত্র পাওয়া গেছে জরিপে। দেশের ৪৩ শতাংশ কৃষিজমিতে সার ব্যবহারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। কীটনাশক ব্যবহারে ৪৯ শতাংশ জমিতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান্ধব ১১টি পদ্ধতির কোনোটি অনুসরণ করা হয় না, যা কৃষকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

সেচ ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে ঘাটতি। দেশের ১৮ শতাংশ জমিতে পর্যাপ্ত সেচের পানি পাওয়া যায় না। সার্বিকভাবে দেশের ৫৭ শতাংশ কৃষিজমি এখনো টেকসই ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আলেয়া আক্তার। তিনি বলেন, “আগে আমরা শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির কথা ভাবতাম। তবে এখন টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশের দিকেও নজর দিতে হবে। উৎপাদন উপকরণের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করে জমির উর্বরতা ধরে রাখাও জরুরি।”

অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, “এই জরিপ আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে কৃষিতে এখন কোন দিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সার ব্যবহারের বিষয়ে যা উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। ইউরিয়া সারসহ অন্য সার আমদানি করে কৃষকের কাছে কম দামে দিতে হয়। অথচ সারের ব্যবহার কমছে না। যেমন মুন্সিগঞ্জে আলু চাষে অতিরিক্ত সার ব্যবহার হচ্ছে। আমরা একটি খামারি অ্যাপ চালু করেছি, যাতে জমির ধরন অনুযায়ী কী ফসল এবং কী পরিমাণ সার প্রয়োজন তা জানা যায়। তবে এটি এখনো কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়নি। জৈব সার ব্যবহারে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।”

পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী বলেন, “আগে কৃষিকে শুধু উৎপাদনের চোখে দেখা হতো। এখন টেকসই দৃষ্টিভঙ্গিতে কৃষি খাতকে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ কৃষি নীতি প্রণয়নে এই জরিপের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম সচিব দীপংকর রায়।

No comments

Powered by Blogger.