Header Ads

দুই বীর নিভে যাওয়ার আগে যে আলো জ্বেলে দিলেন

                         

দুই বীর নিভে যাওয়ার আগে যে আলো জ্বেলে দিলেন



কিছু মৃত্যু ঘটে প্রচণ্ড শব্দে—বুলেট, বিস্ফোরণ কিংবা চিৎকারে। আবার কিছু মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে, কিন্তু গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয় ভেতরটা। সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন ও পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন—এই দুই নামই যেন এমন দুই নীরব বিস্ফোরণ, যা শব্দহীন হলেও হৃদয় বিদীর্ণ করে।

তাদের মৃত্যু শুধুমাত্র দায়িত্ব পালন নয়, বরং মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ—যেখানে নিজের জীবন উৎসর্গ করে অন্যের জীবন বাঁচানোই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৈরি ৪০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র ‘অনির্বাণ’—এই দুই বাস্তব ঘটনার মানবিক দিক তুলে ধরেছে, যা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

গত শুক্রবার রাত ৯টায় সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয় এই ডকুমেন্টারিটি।


তানজিম: গুলি করতে পারতেন, কিন্তু করেননি

কক্সবাজারের চকরিয়ার মাইজপাড়া—এক পাহাড়ঘেরা গ্রাম।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, গভীর রাত।
ডাকাতদল ঠেকাতে সেনা ও পুলিশের যৌথ অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মাত্র ২৩ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন।

অভিযানের সময় তাঁর কাছে নির্দেশ ছিল স্পষ্ট—“ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কোনোভাবেই গুলি চালানো যাবে না, একজন নিরীহ মানুষও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”

ডাকাতরা পালানোর চেষ্টা করছিল। সেনা সদস্যরা দুই দিক থেকে ঘিরে ফেললে তানজিম দূর থেকে দুজনকে দৌঁড়াতে দেখেন। গুলি করতে পারতেন, কিন্তু মানবিক বোধ তাঁকে থামিয়ে দেয়। তিনি খালি হাতে ধাওয়া করে ধরেন এক ডাকাতকে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ওই ডাকাত ছুরি বের করে একের পর এক আঘাত করে তাঁর মাথা ও ঘাড়ে।
চারপাশে চিৎকার ছড়িয়ে পড়ে।
আলোর মতো এক তরুণ নিভে যায় নীরবে।

সহযোদ্ধারা বলেন, “তিনি চাইলে গুলি করতেই পারতেন। কিন্তু তাঁর কাছে জীবন নেওয়ার চেয়ে জীবন বাঁচানোই বড় ছিল।”

তানজিমের মৃত্যু যেন কেবল এক অভিযানের সমাপ্তি নয়—বরং এক আলোর নিভে যাওয়া, যার উষ্ণতা আজও ছুঁয়ে যায় অগণিত হৃদয়কে।


পাহাড়ে মৃত্যুর মুখে শেষ বাক্য: “আমার অস্ত্রটা নিয়ে যা, আমি থাকব...”

‘অনির্বাণ’-এর দ্বিতীয় গল্পটি আরও শ্বাসরুদ্ধকর।
ঘটনা ১২ মার্চ ২০০৩ সালের।
পাহাড়ি এলাকায় বন্যার পর ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসা দিতে সেখানে যায় সেনাবাহিনীর একটি দল। চিকিৎসাসেবা শেষে ফেরার পথে তারা সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলার শিকার হয়।

অন্ধকার পাহাড়ে ছুটে আসে গুলির ঝাঁকুনি।
মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এক সহযোদ্ধা তাঁকে ধরতে এগিয়ে যান।
গোলাগুলির মধ্যেও শোনা যায় নাজিমের কণ্ঠ—
“আমি যেতে পারব না... আমার অস্ত্রটা নিয়ে যা... যেন ওদের হাতে না পড়ে।”

নিজের জীবনের চেয়ে দায়িত্বের অস্ত্রকে বেশি মূল্য দিয়ে তিনি বলেন,
“তুই চলে যা, আমি থাকব। আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি।”

এই এক বাক্যই যেন সৈনিকত্বের মর্মার্থ—
নিজেকে উৎসর্গ করে দায়িত্ব বাঁচিয়ে রাখা।
যেন এক হাতে আলো নিভে গিয়ে অন্য হাতে জ্বলে ওঠে নতুন আলো।

তানজিম বা নাজিম—কেউ যুদ্ধ করতে যাননি।
তারা গিয়েছিলেন মানুষ বাঁচাতে, অপরাধ ঠেকাতে।
কিন্তু তবুও, তারা আর ফিরে আসেননি।
তাদের হাতে অস্ত্র ছিল, কিন্তু তারা ছিলেন মানবতার সৈনিক।


পরিবার ও সহযোদ্ধাদের স্মৃতিতে

লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ারের বাড়ি টাঙ্গাইলের তিনবেতকা গ্রামে।
তিনি সারোয়ার জাহান (দেলোয়ার) ও নাজমা বেগমের একমাত্র পুত্র।
পাবনা ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে আর্মি সার্ভিস কোরে কমিশন লাভ করেন।

বাবা সারোয়ার জাহান এখনো স্তব্ধ হয়ে যান ছেলের কথা বলতে গিয়ে।
মা নাজমা বেগম বলেন,
“ছেলেকে যুদ্ধ করতে পাঠাইনি, মানুষ বাঁচাতে পাঠিয়েছিলাম। সে নিজের জীবন না ভেবে আরেকজনকে বাঁচাতে গিয়েছিল।


‘অনির্বাণ’: এক নীরব শোকগাথা

৪০ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায় তানজিমের শেষ অভিযানের ভিডিও ফুটেজ—
অন্ধকারে মাইক থেকে ঘোষণা হচ্ছে, “সতর্ক থাকুন, সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলেছে।”
তারপর দ্রুতগতিতে দৌঁড়ে যাওয়া সৈনিকরা—
এরপরই দেখা যায় নিথর পড়ে থাকা তরুণ অফিসার তানজিম।

অন্যদিকে পাহাড়ি অভিযানের দৃশ্যে দেখা যায় আহত এক সৈনিককে ফেলে রাখা হয়নি। সহযোদ্ধা তাঁর অস্ত্র কাঁধে তুলে নিচ্ছেন, আর নিচে পড়ে আছেন নাজিম। ক্যামেরা তাঁর মুখে যায় না, কিন্তু চোখে ধরা পড়ে অদম্য সাহসের শেষ ঝলক।


দর্শকের চোখে ‘অনির্বাণ’

চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক শিক্ষার্থী এই ডকুমেন্টারি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আতিকুর রহমান বলেন,
“রাত ২টার দিকে ভিডিওটা দেখি। যখন দেখি তানজিম গুলি না করে খালি হাতে ধরতে গিয়েছিলেন—আর মুহূর্তেই মারা যান—আমি এক মুহূর্তের জন্য নিশ্বাস নিতে পারিনি। মনে হয়েছিল, এই দেশ এখনো এমন মানুষে ভরপুর।”

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র সজিব ওয়াজেদ বলেন,
“আমি অনেক সিনেমা দেখি, কিন্তু ‘অনির্বাণ’ দেখার সময় বুঝলাম—এটা কোনো গল্প নয়, এক নির্মম বাস্তবতা। পাহাড়ে মৃত্যুর আগে অফিসারের সেই কথা, ‘তুই চলে যা’—আমাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এরা যুদ্ধ করতে যায়নি, কিন্তু সত্যিকারের বীরের মতো জীবন দিয়ে গেছে।


‘অনির্বাণ’ তাই কেবল একটি প্রামাণ্যচিত্র নয়—এটি এক নীরব প্রতিজ্ঞার গল্প,
যেখানে তানজিম ও নাজিমের নিঃশব্দ মৃত্যু নতুনভাবে শেখায়,
বীরত্ব মানে বন্দুক নয়,
বীরত্ব মানে—অন্যকে বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করা।

No comments

Powered by Blogger.