নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত, কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াতে, আলোচনায় কারা
গাজীপুর-৬ ও নরসিংদী-৫ আসন বাদে দেশের বাকি ২৯৮ আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রার্থী নির্ধারণের পর কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি শুরু করেছে দলটি। পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ এবং ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে এসব কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
জামায়াতের লক্ষ্য—ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনায় ন্যায় ও সমতাভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দলটি নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী পদ্ধতি (সংখ্যানুপাতিক বা পিআর) নিয়ে বিএনপি ও অন্যান্য দলের সঙ্গে মতবিরোধ এখনো রয়ে গেছে।
তরুণ নেতৃত্বের উত্থান
এবারের নির্বাচনে ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী তরুণদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। তারা নীরবে মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন এবং স্থানীয় উন্নয়নকেন্দ্রিক কার্যক্রমে মনোযোগ দিচ্ছেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকারকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, “এখন গ্রামে গ্রামে মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি, যা আগে কখনো দেখিনি।”
নেতৃত্ব পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ২০ সদস্যের মধ্যে ১৫ জন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
-
আমির ডা. শফিকুর রহমান: ঢাকা-১৫
-
সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার: খুলনা-৫
-
নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান: রাজশাহী-১
-
এ টি এম আজহারুল ইসলাম: রংপুর-২
-
সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: কুমিল্লা-১১
এছাড়া আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বিভিন্ন আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
আলোচনায় তরুণ ও পুরোনো মুখ
ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের মধ্যে এবার প্রার্থী হচ্ছেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ (পটুয়াখালী-২), শিশির মনির (সুনামগঞ্জ-২), এবং দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী (ঠাকুরগাঁও-১)। এছাড়া আলোচিত ইসলামি বক্তা আমির হামযাকেও কুষ্টিয়া-৩ আসনে প্রার্থী করেছে দলটি।
দণ্ডিত নেতাদের সন্তানেরাও নির্বাচনী মাঠে
যুদ্ধাপরাধ মামলায় দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের সন্তানরাও প্রার্থী হয়েছেন।
-
মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান মোমিন (পাবনা-১)
-
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দুই ছেলে মাসুদ (পিরোজপুর-১) ও শামীম (পিরোজপুর-২)
-
মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমদ বিন আরমান (ঢাকা-১৪)
প্রার্থী ঘোষণা হয়নি দুই আসনে
গাজীপুর-৬ ও নরসিংদী-৫ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে আপত্তি থাকায় এই দুই আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
দলীয় অসন্তোষ ও বিরোধ
পাবনা-৫, ময়মনসিংহ-৬ এবং চট্টগ্রাম-১৫ আসনে মনোনয়ন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিক্ষোভও হয়েছে। তবে নেতৃত্ব জানিয়েছে, প্রার্থী পরিবর্তনের কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
সমঝোতা ও নির্বাচনী কৌশল
১৯৯৬ সালের পর এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়নি জামায়াত। এবার ইসলামপন্থী কয়েকটি দলের সঙ্গে জোটের আলোচনা চললেও দলটি আপাতত একক প্রস্তুতিতেই এগোচ্ছে।
মাঠে সাড়া পেয়ে আশাবাদী জামায়াত
জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, মাঠের কার্যক্রমে জনগণের সাড়া আগের তুলনায় অনেক বেশি। সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। তারা বলছে, পুরোনো চিত্র আর দেখতে চায় না। জামায়াতকে এখনো পরীক্ষা করা হয়নি, আমরা সেই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত।”
দলীয় জরিপে দেখা গেছে, রংপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ এবং ঢাকার কিছু আসনে জামায়াত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছে।
সংক্ষিপ্ত সার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। তরুণ প্রার্থী, কেন্দ্রভিত্তিক সংগঠন, নীরব প্রচারণা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দলটি ভোটের মাঠে নতুন চিত্র উপস্থাপন করতে চাইছে। এখন দেখার বিষয়—এই প্রস্তুতি ভোটের ফলাফলে কতটা প্রতিফলিত হয়।


No comments