১২ লাখ খেলাপির হাতে আটকে আছে ৬ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা
দেশের ব্যাংক খাত এখন গভীর সংকটে পড়েছে। একদিকে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে, অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে মোট ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৭৬ লাখ ৫ হাজার ৯২৩ জন। ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণগ্রহীতা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫৬ জন—অর্থাৎ মোট ঋণগ্রহীতার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ এখন খেলাপির তালিকায়। এ ছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৪৮৩ জন। এসব খেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো যে ঋণগুলো অবলোপন করেছে—সেসবের গ্রাহক সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৬ জন। অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা, তবে আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া হিসাব যোগ করলে এই অঙ্ক বেড়ে হয় ৬৪ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা হিসাবের কারণে আরও ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা আটকে আছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। শুধু ব্যাংক খাতেই খেলাপি ঋণের অঙ্ক ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ ৬৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকা—যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। আগে অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার বকেয়া ঋণ ‘নিয়মিত’ দেখানো হতো। কিন্তু নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে আসল অবস্থাটা সামনে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, ২০২৫ সালের জুনে তা প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছে। শুধু তিন মাসেই (এপ্রিল–জুন) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা—যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে—
১️⃣ আগের সরকারের সময়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিভিন্ন নামে-বেনামে বিপুল ঋণ নিয়েছিল, যা গোপন রাখা হয়েছিল। এখন সেগুলো প্রকাশ পাচ্ছে।
২️⃣ আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী খেলাপি ঘোষণার সময়সীমা ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস করা হয়েছে।
৩️⃣ কৃষি ও এসএমই খাতে খেলাপি ঘোষণায় যে বিশেষ ছাড় ছিল, সেটি বাতিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, আগের সরকারের সময়ে অনেক গ্রাহক আদালতের বিশেষ আদেশে খেলাপি ঋণও নিয়মিত দেখাতে পারতেন। এখন সেই সুযোগ নেই। এছাড়া, ৫ আগস্টের পর থেকে অনেক চালু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে তাদের ঋণও খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ঋণ পুনরুদ্ধার। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা নীতি সহায়তা পাবেন, কিন্তু ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ছাড় দেওয়া হবে না। আগামী প্রান্তিক থেকেই এই নীতি বাস্তবায়ন শুরু হলে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে আসবে বলে আশা করছেন তারা।
তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের ৪৫ শতাংশ এখন খেলাপি, যা গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৪২.৮৩ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও খেলাপির হার বেড়ে ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—যেখানে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ছিল ১৫.৬০ শতাংশ।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ১৬ বছরে সেই অঙ্ক বেড়ে ৩০ গুণেরও বেশি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এগুলো হলো—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বেশিরভাগ আগে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নতুন প্রশাসনের অধীনে এস আলমের প্রভাবমুক্ত হওয়ার পর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সামনে এসেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত (মার্জার) করার প্রস্তুতি নিয়েছে, যাতে খাতটিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো যায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণা পরিচালক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব বলেছেন, ঋণখেলাপি সমস্যা বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এতদিন বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল, এখন তা প্রকাশ পাচ্ছে। কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে সেটি স্বীকার করতে হয়—বর্তমান সরকার সেটি করছে। অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা ইতিমধ্যে দেশ ছেড়েছেন, ফলে তাদের অনাদায়ী ঋণ ও গোপন খেলাপিগুলো এখন একত্রে ধরা পড়ছে। তাঁর মতে, এই খেলাপিদের আইনের আওতায় আনা এবং নেপালের মতো প্রকাশ্যে নাম ঘোষণা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দেশের জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। এই অর্থ ফেরত না এলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগে।
একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার বলেন, ব্যাংক খাতে এখন এক ধরনের ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ চলছে। বড় খেলাপিরা টাকা ফেরত না দেওয়ায় ব্যাংকের তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ঋণ দেওয়া যাচ্ছে না, ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে, এবং বন্ধ ব্যবসার কারণে নতুন খেলাপিও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদুজ্জামান বলেন, এখন ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে হলে কঠোরভাবে ঋণ আদায় শুরু করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় আর ছাড় দেওয়া যাবে না। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সম্পদ জব্দ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে হবে, নাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণ কমাতে তিনটি পদক্ষেপ নিয়েছে—
১️⃣ ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও সম্পদ জব্দ,
২️⃣ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য নীতি সহায়তা,
৩️⃣ দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক–দুই প্রান্তিকের মধ্যে ব্যাংক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।


No comments