এখন মোদির আশ্রয়ে দুই জেনারেল
পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের জন্য পরিচিত সেনাবাহিনীর দুই প্রাক্তন জেনারেল—লে. জেনারেল (বরখাস্ত) মো. মুজিবুর রহমান এবং লে. জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন—বর্তমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তত্ত্বাবধানে আশ্রয় নিয়েছেন বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা ছিল, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, আয়নাঘরের নৃশংসতা এবং বিরোধীদল দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা হয়তো ভারতে গা ঢাকা দিয়েছেন। নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, অভিযুক্ত এই দুই জেনারেল বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে কলকাতায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তারা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে পুনরায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতের গোপন তৎপরতার অংশ হিসেবে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ঘটনা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। ভারত নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে এই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারের এখনই এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করা উচিত এবং ভারত কীভাবে অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা প্রয়োজন। তবে আইএসপিআর জানিয়েছে, তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।
সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে থাকা সবার পূর্ণাঙ্গ তথ্যসংগ্রহ করছে ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি)। প্রায় ৭৩৪ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত সেই ডেটাবেসে সাবেক দুই জেনারেল ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত পরিচয়, পাসপোর্ট নম্বর, ভারতীয় ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
লে. জেনারেল মুজিবুর রহমান বর্তমানে স্ত্রী, সন্তান ও নাতিকে নিয়ে কলকাতায় বসবাস করছেন। সেনা সূত্র অনুযায়ী, তিনি গত বছর ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। শেখ হাসিনার অন্যতম বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি সেনা ও পুলিশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলায় বড় ভূমিকা রাখেন। এমনকি ২০২৪ সালের আগস্টে সেনাবাহিনীতে ভারতপন্থি ক্যু ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। শেখ হাসিনার ভারতে পালানোর সময় ‘মোদির রেসকিউ মিশন’-এর অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবেও তার নাম উঠে আসে।
অভ্যুত্থানচেষ্টা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং র্যাবের কুখ্যাত কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ। দুর্নীতির মামলায় দুদক তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে, আদালত তাদের সম্পদ জব্দের আদেশও দিয়েছে।
অন্যদিকে লে. জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, যিনি ছিলেন ডিজিএফআই-এর সাবেক প্রধান, তাকেও শেখ হাসিনার অনুগত ও ভারতের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ২০১৪ সালের বিনাভোটের নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের রাতের ভোট আয়োজনের নেপথ্যে তার ভূমিকা ছিল। এমনকি সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে দেশ থেকে সরানোর ঘটনায়ও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। বর্তমানে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় অবস্থান করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এ ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দুই জেনারেল ভারতে আশ্রয় নিয়েছে শুধুমাত্র আরাম-আয়েশের জন্য নয়, বরং শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ভারতের পরিকল্পনার সঙ্গে তারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মুনিরুজ্জামানও বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং এর সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদি তারা অপরাধে জড়িত থাকে তবে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা উচিত।
অন্যদিকে, আইএসপিআর-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই সাবেক জেনারেলের পালিয়ে যাওয়া বা ভারতে আশ্রয় নেওয়া সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই।


No comments