কেন রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা?
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগামী রোববার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। এই সফরে তার সঙ্গে যাচ্ছেন তিনটি রাজনৈতিক দলের চারজন নেতা। সরকারি সফরে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে দেশে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ইউনূস ২ অক্টোবর দেশে ফেরার আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিতে পারেন।
তবে রাজনৈতিক নেতাদের সফরসঙ্গী করার উদ্দেশ্য কী, তাদের ভূমিকা কী হবে এবং কেন কেবল তিনটি দলের প্রতিনিধিদের নেওয়া হচ্ছে—এসব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার ও রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ঐক্যবদ্ধতার বার্তা আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতেই তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের হাতে যাবে, তাই তাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় সম্পৃক্ত রাখা প্রয়োজন।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি দল থেকে প্রতিনিধি নেওয়া হলে অন্য দলগুলোর কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে কি না। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ জানিয়েছেন, প্রতিনিধিত্ব বাছাইয়ে দলের রাজনৈতিক প্রভাব, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। আবার বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক দায় ভাগ করে নেওয়ারও একটি কৌশল।
প্রতিনিধি কারা যাচ্ছেন?
প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন।
তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিভিন্ন সাইডলাইন বৈঠকে যোগ দেবেন এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গেও এক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। বিএনপি মহাসচিবের মতে, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক ঐক্যের বার্তা দেওয়া। জামায়াত নেতা তাহেরও জানিয়েছেন, অধিবেশনের পাশাপাশি আরও কিছু সেশনে তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যা
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, দেশ এখন রূপান্তরের পথে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে, তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত রাখা হচ্ছে যেন ভবিষ্যৎ সরকার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।
ফয়েজ আহম্মদ বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা জরুরি। এ কারণেই প্রতিনিধি দলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, প্রধান উপদেষ্টা মার্কিন প্রভাব মোকাবিলায় ঝুঁকি ভাগ করে নিতে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নিচ্ছেন। এতে বিরোধিতার সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে তিন দলের প্রতিনিধিত্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতার পথও খুলতে পারে।
কেন এই তিন দল?
গত কয়েক মাসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অন্তত ৩০টি দল অংশ নিলেও প্রতিনিধি হিসেবে বাছাই করা হয়েছে কেবল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিকে।
ফয়েজ আহম্মদের মতে, ভিন্ন আদর্শ থাকলেও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রশ্নে সব দলের মধ্যে একটি সাধারণ ঐক্য রয়েছে, আর এই তিন দলকে নেওয়ার মাধ্যমে মূল রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিএনপি ও জামায়াত বড় রাজনৈতিক শক্তি, আর সাম্প্রতিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে এনসিপিকেও বিবেচনায় আনা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা হিসেব করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তাদের রাজি করাতে পারলে বাকি দলগুলোকেও সহজে সমন্বয় করা সম্ভব হবে।


No comments