Header Ads

শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল—এরপর কি ভারত?

                                 

শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপাল—এরপর কি ভারত?

   

নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি কয়েকজন মন্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হেলিকপ্টারে পালিয়ে গেছেন। শোনা যাচ্ছে তিনি হয়তো ভারত অথবা দুবাইয়ের দিকে আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়েছে, যেন রাস্তায় পকেটমারকে ধরে পেটানো হয়। অলির বাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রীর বাড়ি জ্বলছে। নেপালি কংগ্রেসের কার্যালয়েও আগুন লাগানো হয়েছে। এমনকি মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। বিক্ষোভ যেন থামছেই না, বরং আরও নতুন করে জ্বলে উঠছে।

যদিও শুরুতে আন্দোলনটা ছিল আপাতদৃষ্টিতে অরাজনৈতিক, পরে দেখা যায়—এখানে রাজনৈতিক দল, এমনকি রাজতন্ত্রের সমর্থকেরাও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী রাজধানী কার্যত ছাত্র-যুবাদের দখলে। সামাজিক মাধ্যমের অধিকার ফেরত পেলেও তারা এখনো রাস্তায়। পুলিশের ওপর হামলা হচ্ছে, আর সেনারা দাঁড়িয়ে নীরব দর্শকের মতো সবকিছু দেখছে। বিক্ষোভকারীরা দাবি তুলেছেন—গুলির বিচার, দুর্নীতির পূর্ণ তদন্ত এবং নতুন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা। তারা এটিকে “জেন-জির বিপ্লব” বলছে এবং ঘোষণা দিচ্ছে, “আমরা নতুন সমাজ গড়ব।”

এই ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি অঞ্চলের কয়েকটি দেশে একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, যা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

শ্রীলংকা: অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে পতন

প্রথমে নজর দিতে হয় শ্রীলংকার দিকে। কয়েক বছর আগে দেশটিতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট রাজাপাকসে পরিবারের দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটায়। মূল কারণ ছিল অব্যবস্থাপনা। ২০১৯ সালে কর ছাঁটাইয়ের অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে রাজস্ব মারাত্মকভাবে কমে যায়। একইসঙ্গে উচ্চসুদের বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

কৃষিক্ষেত্রে ভুল নীতির কারণে উৎপাদন ধসে পড়ে। এরপর কোভিড-১৯ মহামারিতে পর্যটন খাত ভেঙে পড়ে। ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে তোলে। সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ফুরিয়ে যায়, আমদানি অসম্ভব হয়ে পড়ে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি ও ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতিতে জনজীবন অচল হয়ে পড়ে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে পালিয়ে যান।

বাংলাদেশ: কোটা সংস্কার থেকে গণঅভ্যুত্থান

বাংলাদেশে প্রথমে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিকে ঘিরে। কিন্তু সরকারের দমননীতি, ইন্টারনেট বন্ধ, পুলিশি নির্যাতন ও মিথ্যা প্রচারণায় আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়, আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী বৃহৎ রূপ নেয়।

জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যাতে জুলাই-আগস্টে প্রায় ৬৫০ জন নিহত হন। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয়, তারা জনগণের ওপর গুলি চালাবে না। এর পরই ৫ আগস্ট সরকার পতন ঘটে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—অত্যধিক দমননীতি বরং আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে, আর সেনাবাহিনীর অবস্থান সরকারের টিকে থাকার জন্য নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়।

নেপাল: সামাজিক মাধ্যম থেকে জাতীয় বিদ্রোহ

নেপালের ক্ষেত্রে আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারের সিদ্ধান্তে—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ ২৬টি সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এগুলো সরকারের সঙ্গে নিবন্ধিত নয়। কিন্তু এতে ব্যবসা, পর্যটন, প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তরুণদের অনলাইন আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

শুরুতে সীমিত দাবি থাকলেও পরে বিক্ষোভকারীরা বলেন, বিষয়টা শুধু সামাজিক মাধ্যম নয়—আসলে এটা দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই। নেতাদের সন্তানরা বিলাসিতায় বড় হচ্ছে, অথচ সাধারণ তরুণরা ভবিষ্যৎহীন। তাই আন্দোলন এখন পুরোপুরি নতুন প্রজন্মের হাতে। একে তারা “প্রযুক্তি-প্রণোদিত” আন্দোলন বলছে, যার পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে।

প্রশ্ন: ভারতও কি ঝুঁকিতে?

এখন প্রশ্ন উঠছে, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, নেপালের পর ভারতেও কি এমন গণঅভ্যুত্থান সম্ভব?

ভারতের অর্থনীতি কিছু দিক থেকে শক্তিশালী। শেয়ারবাজার নতুন রেকর্ড গড়ছে, বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তবে বাস্তবতায় বিশাল বৈষম্য আছে। শহুরে মধ্যবিত্তের একটি অংশ মোটামুটি ভালো থাকলেও শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ভয়াবহ। ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৫ শতাংশেরও বেশি। খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ কারণে তরুণ প্রজন্ম হতাশ, যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

আগেও ভারত বড় বিক্ষোভ দেখেছে। বিতর্কিত কৃষি আইনের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর কৃষকদের আন্দোলনে সরকার শেষ পর্যন্ত আইন প্রত্যাহার করে। ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী বিক্ষোভও দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছিল। তবে এগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট দাবিনির্ভর আন্দোলন।

ভারতের রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলো বিভক্ত এবং দুর্বল, তাই জনগণের ক্ষোভ একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে না। আবার ১৯৫০ সাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ঐতিহ্যও আছে। জনগণ এখনো বিশ্বাস করে, ভোট দিয়েই পরিবর্তন সম্ভব। এই বিশ্বাস নেপাল, বাংলাদেশ বা শ্রীলংকায় ছিল না।

তবুও একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ভারত সম্পূর্ণ নিরাপদ। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর যদি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের মতো বিস্ফোরক গণআন্দোলন এখানেও দেখা দিতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.