জনতা ব্যাংকে ছয় মাসে সংগ্রহ মাত্র ৯ কোটি টাকা
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত অবস্থায় রয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে কেবল শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রুপের কাছেই আটকে আছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণ আদায়ে ব্যাংক কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৯ কোটি টাকার কিছু বেশি। এ দুর্বল আদায় ব্যবস্থার কারণে জনতা ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে পড়েছে। বিষয়টি উঠে এসেছে ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুন শেষে জনতা ব্যাংকের বিতরণকৃত মোট ঋণ ছিল ৯৪ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। খেলাপি ঋণের মধ্যে প্রায় ৬৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা আদায় অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত।
শুধু শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রাহকের কাছেই আটকে আছে ৫৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে তাদের কাছ থেকে নগদ আদায় হয়েছে মাত্র ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে অন্যান্য খেলাপিদের কাছ থেকে আদায় হয়েছে ২৩৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ছয় মাসে ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ থেকে আদায় করতে পেরেছে মোট ২৪২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
একই সময়ে ব্যাংকের আমানত কিছুটা বেড়েছে। জুন শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের ডিসেম্বরের এক লাখ ৯ হাজার ২০৬ কোটি টাকার তুলনায় বেশি।
জনতা ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ঋণ নিয়েছিলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তা ফেরত দেননি। ফলে ব্যাংকে বড় ধরনের লুটপাট হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেকে দেশ ছেড়েছেন, আবার কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর প্রভাবেই শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে আদায় কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
জনতা ব্যাংকের সর্বাধিক ঋণখেলাপি গ্রাহকদের তালিকায় রয়েছে— বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, এননটেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, রানাকা গ্রুপ, রতনপুর গ্রুপ, রিমেক্স ফুটওয়্যার, শিকদার গ্রুপ, জনকণ্ঠ গ্রুপ, লিথুন ফ্যাব্রিক্স, হাবিব হোটেল, লেক্সকো লিমিটেড, চৌধুরী গ্রুপ, আনন্দ শিপইয়ার্ড, বিআর শিপিং মিলস, ঢাকা নর্থ পাওয়ার, ইব্রাহিম গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, ডেল্টা কম্পোজিট এবং আদিল করপোরেশন।
খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বরে ছিল মাত্র ১৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা। যদিও ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেফারাল সুবিধা নেওয়ায় সাময়িকভাবে কিছু চাপ কমানো হয়েছিল। তবুও জুন শেষে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ঋণাত্মক ১৭ হাজার ২৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ১০ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে নিট সুদ আয় হ্রাস পাওয়ায় জনতা ব্যাংক বড় ধরনের লোকসানে পড়ে। গত বছর ব্যাংকটির লোকসান হয়েছে তিন হাজার ৭০ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর ব্যাংক মুনাফা করেছিল ৬২ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই লোকসান দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৭১ কোটি টাকা।
শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান জানান, শুধু জনতা ব্যাংক নয়, প্রায় সব ব্যাংকই বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে সমস্যায় পড়ছে। তারপরও টাকা ফেরত আনার জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।


No comments