নির্বাচনে কোনো বিদেশি শক্তি যেন থাবা মারার সুযোগ না পায়
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে চায় তারা নানা উপায়ে চেষ্টা করবে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
মঙ্গলবার বিকাল পাঁচটা থেকে দেড় ঘণ্টা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সাতটি রাজনৈতিক দল এবং হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে বিভিন্ন দল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচন সমন্বয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে বড়-ছোট রাজনৈতিক দলের মধ্যে বৈষম্য না রেখে সর্বদলীয় বৈঠকের আহ্বান জানানোর পরামর্শও আসে। কয়েকটি দল আওয়ামী লীগের সহযোগী দলগুলোর কার্যক্রম স্থগিতের দাবি জানায়।
সেদিনের আলোচনায় অংশ নেয় এবি পার্টি, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, এলডিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাতীয় গণফ্রন্ট। বৈঠকের পর গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের স্ত্রী মারিয়া আক্তার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলাদা সাক্ষাৎ করেন।
এর আগে গত রোববার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে বৈঠকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন ড. ইউনূস। মঙ্গলবারও তিনি সেই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “যারা চায় না নির্বাচন হোক, তারা নানা কৌশলে বাধা দেবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইবে যাতে নির্বাচন না হয়। আমরা সতর্ক থাকব এবং নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন করব। নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের কাছে আমরা ক্ষমতা হস্তান্তর করব।”
তিনি আরও বলেন, “এবারের নির্বাচন হবে দেশের সব মানুষের। এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন। এখানে বিদেশি হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ থাকবে না। আমরা চাই, সবাই মিলে এই নির্বাচনকে সফল করি।”
বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা সরকারের নানা দুর্বলতা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে দৃঢ়তা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এতে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব কমাতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ইসলামী আন্দোলনের নেতা আশরাফ আলী আকন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। এখনো সন্ত্রাস দমন করা যাচ্ছে না, তাহলে নির্বাচনে জালভোট ও ব্যালট ছিনতাই কীভাবে রোধ করা হবে? তিনি নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং এ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের দাবি জানান।
এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ অভিযোগ করেন, প্রশাসনে আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তাদের প্রভাব রয়ে গেছে। মাঠ প্রশাসনের বদলিকে লটারির মাধ্যমে করা ‘শিশুসুলভ’ সিদ্ধান্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে তা উদ্ধার না করলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে না।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্বলতার কারণে সংকট বাড়ছে। তিনি প্রস্তাব দেন, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হোক, যাতে নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুর রহমান ইসলামাবাদী বলেন, সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করতে হবে। একইসঙ্গে আওয়ামী সরকারের সময়কার অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, প্রশাসন ও বাহিনী এখনো অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত নয়। তাই মনে হচ্ছে দেশে দুটি সরকার চলছে—একটি দৃশ্যমান, আরেকটি অদৃশ্য।
বৈঠক শেষে প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া সব প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টা নোট করে রেখেছেন এবং সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে এবং ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে।


No comments