Header Ads

৮০ কোটি টাকা কমিশন ডিসি-এসপির পকেটে

 
                             

৮০ কোটি টাকা কমিশন ডিসি-এসপির পকেটে



সিলেটের পাথরকাণ্ডে একের পর এক বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই লুটপাটে শুধু রাজনীতিবিদ নন, স্থানীয় প্রশাসনের প্রায় সব স্তরের কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), সহকারী কমিশনার (ভূমি), পুলিশ সুপার (এসপি), থানার ওসি থেকে শুরু করে কোম্পানীগঞ্জে দায়িত্বপ্রাপ্ত চারজন ইউএনও পর্যন্ত সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিলেন।

দুদক এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পুলিশের বিশেষ ইউনিট পুলিশ ইন্টার্নাল ওভারসাইট (পিআইও)-এর কর্মকর্তারাও কমিশনের ভাগ নিয়েছেন। প্রতি ট্রাক পাথরের জন্য পুলিশকে দেওয়া হতো ১০ হাজার টাকা। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্থানীয় বিজিবির সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ কোটি ঘনফুট পাথর লুটপাটে অন্তত ৮০ কোটি টাকা কমিশন গেছে প্রশাসনের পকেটে।

৮০ হাজার ট্রাকে ৪ কোটি ঘনফুট পাথর

পরিবেশবাদীদের হিসাব অনুযায়ী, সিলেট থেকে লুট হওয়া পাথরের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ঘনফুট। প্রতি ট্রাকে গড়ে ৫০০ ঘনফুট ধরে হিসাব করলে, এতে লেগেছে অন্তত ৮০ হাজার ট্রাক। প্রতিটি ট্রাকের বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে ডিসি, এসপি, ওসি, ইউএনও, এসিল্যান্ড ও ডিবি কর্মকর্তারা ট্রাকপ্রতি অন্তত ১০ হাজার টাকা কমিশন পেতেন। নৌকাপ্রতি নেওয়া হতো আরও ১ হাজার টাকা, যার ভাগও স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন হতো।

পর্যটনকেন্দ্র থেকে বালুচরে

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেটের ভোলাগঞ্জ, জাফলং, বিছনাকান্দি ও উৎমাছড়া একসময় ছিল পর্যটকদের স্বর্গ। বিশেষ করে ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র ছিল প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকে সংঘবদ্ধ চক্রের লুটপাটে এসব কেন্দ্র বালুচরে পরিণত হয়েছে। শুরু থেকেই গণমাধ্যম বিষয়টি প্রকাশ করলেও প্রশাসন নিরব থেকেছে। লুট শেষ হওয়ার পর নামমাত্র অভিযান চালানো হলেও, এখন পর্যন্ত লুট হওয়া পাথরের ২ শতাংশও উদ্ধার সম্ভব হয়নি।

প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ কয়েকশ কোটি টাকার পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। লুট করা পাথর প্রথমে স্থানীয় স্টোন ক্রাশারে জমা করা হতো। পরে ছোট টুকরো করে বাজারজাত করা হতো, যাতে চুরির প্রমাণ মুছে যায়।

  • বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী: লুট বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ। বরং ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের অবৈধ স্বার্থ রক্ষায় সহায়তার প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দারা।

  • সাবেক ডিসি মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ: সদিচ্ছার অভাব, অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

  • চার ইউএনও (আজিজুন্নাহার, আবুল হাসনাত, ঊমী রায় ও আবিদা সুলতানা): দায়িত্ব পালনের সময় কেবল নামমাত্র ব্যবস্থা নিয়েছেন, কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।

  • এসপি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও লুট বন্ধে ব্যবস্থা নেননি।

  • ওসি উজায়ের আল মাহমুদ আদনান ও কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশ: সরাসরি কমিশন নিয়ে লুটে সহায়তা করেছেন।

  • পুলিশের বিশেষ ইউনিট পিআইও: দুর্নীতির নজরদারি করার কথা থাকলেও তাদের দুই সদস্যও কমিশনের ভাগ নিয়েছেন।

  • বিজিবি সদস্যরা: নৌকাপ্রতি ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই লুটে জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি—সব দলেরই নেতাকর্মীরা।

  • বিএনপি: মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীসহ অন্তত ১৮ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

  • আওয়ামী লীগ: কোম্পানীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল ওদুদ আলফুসহ অন্তত ৭ জন জড়িত।

  • জামায়াত: মহানগর জামায়াতের আমির ফকরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীনসহ অন্তত ৪ জনের নাম এসেছে।

  • এনসিপি: জেলা প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন ও মহানগর সমন্বয়কারী আবু সাদেক খায়রুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়েছে।

  • স্থানীয় প্রভাবশালী: আরও অন্তত ১১ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম রয়েছে।

তদন্ত ও সুপারিশ

লুটের ঘটনায় জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটি ১৩৭ জনের নাম সংযুক্ত করে ৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে পাথর লুট ও পরিবেশ ধ্বংসের বিস্তারিত তুলে ধরে ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিশনারের ব্যাখ্যা

বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী বলেছেন, তিনি পাথর চোরদের উৎসাহিত করার মতো কিছু বলেননি। বরং পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রকৃত দোষীদের নাম প্রকাশ করা হবে। একইসঙ্গে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার ও নতুন ক্যাম্প ও চেকপোস্ট স্থাপনের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

দুদকের পদক্ষেপ

দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি শিগগির কমিশনে তোলা হবে। প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

No comments

Powered by Blogger.