বিএনপি ও আওয়ামী লীগ কি একই মুদ্রার দুই পিঠ?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুটি প্রধান দল হিসেবে বিবেচিত হলেও, আদর্শ, অর্জন এবং নীতির দিক থেকে এদের মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট পার্থক্য। চলুন দেখে নেওয়া যাক—দুটি দলের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, অর্থনীতিতে অবদান, পররাষ্ট্রনীতি, গণতন্ত্রচর্চা এবং সমাজভাবনায় কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
অর্থনৈতিক অবদান: উন্নয়নের ভিন্নধারা
বিএনপির সময় দেশের অর্থনীতিতে যে দুটি প্রধান ভিত্তি স্থাপন করা হয় তা হলো—রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের প্রসার এবং শ্রমশক্তির প্রবাসমুখী রপ্তানি। ১৯৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই খাত দুটি উন্মুক্ত করেন, যা আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার শাসনামলে প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশ, শিল্পবিপ্লবের গতি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এর বিপরীতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অর্থনীতিতে বারবার দেখা গেছে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জনগণের ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট-ট্যাক্সের বোঝা এবং বিদেশি ঋণনির্ভরতার আশঙ্কাজনক প্রবণতা। এইসব আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন।
পররাষ্ট্রনীতি: আলাদা কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভারত ও সোভিয়েত নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তে জিয়াউর রহমান পশ্চিমা দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। তিনিই সার্ক গঠনের প্রস্তাব দেন, এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ আরও বিস্তৃত হয়। তার উদ্যোগে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, জাইকা ও আইডিবির মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে আঞ্চলিক নির্ভরতা ও সামঞ্জস্যের চেয়ে দলীয় সুবিধার প্রশ্নে অনেক সময় আপস করেছে—যা কখনও কখনও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
আদর্শিক পার্থক্য: জাতীয়তাবাদ বনাম দলীয় মতাদর্শ
আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললেও, সময়ের পর সময়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ উঠেছে। অনেকের মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যানারে দলটি দীর্ঘ সময় ধরে বিভাজনের রাজনীতি করেছে।
অন্যদিকে, বিএনপি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই "বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ"-এর আদর্শকে ধারণ করে আসছে। এই আদর্শের মূল ভিত্তি হলো—সব শ্রেণি, ধর্ম, মত ও পেশার মানুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একাধিক সংবাদমাধ্যম, টিভি চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ কিংবা বন্ধের নজির রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা ব্যবস্থার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।
বিএনপির আমলে, তুলনামূলকভাবে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। বিদেশি ও দেশি বিশ্লেষকদের মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিএনপির সরকার কোনো ভুয়া প্রচারণার আশ্রয় না নিয়ে সমালোচনাকে বরং সহ্য করেছে বলে অনেকের মত।
গণতন্ত্রচর্চা ও ভোটাধিকার
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগ একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে বহুবার গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বারবার ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যার সর্বশেষ নজির ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন।
অপরদিকে বিএনপি প্রতিষ্ঠাকালীন সময়েই বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে। বারবার গণআন্দোলনের মাধ্যমে দলটি ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছে।
নারী শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
খালেদা জিয়ার শাসনামলে নারীর ক্ষমতায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়। স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের উপবৃত্তি, নারী শিক্ষাকে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এই নতুন প্রজন্ম আজ দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এসব শিক্ষার্থী যখন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তখন তাদের ওপর চালানো হয় সহিংসতা—যা আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনেকাংশেই নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।
ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি: ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে সংবিধান পরিবর্তন করে বারবার নিজের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন—প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ পরপর দুই মেয়াদের বেশি করা যাবে না। এছাড়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের মাধ্যমে সুশীল সমাজকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পৃক্ত করার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন।
এটি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এবং সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনার একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
শেষ কথা: দুই দলের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট
স্পষ্টতই, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনৈতিক আদর্শ, নীতি, এবং কার্যক্রমে একে অপরের পরিপূরক নয়। একদিকে আওয়ামী লীগ যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, অন্যদিকে বিএনপি বারবার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে। তাই বিএনপির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক কাতারে দেখা অনেকাংশেই ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের মানুষ আজ এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চায়, যেখানে ভোট হবে স্বাধীনভাবে, সরকার হবে জবাবদিহিমূলক, আর রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবে সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ। তারেক রহমানের ঘোষণাগুলো সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
তিনি বিশ্বাস করেন—তরুণ সমাজ, প্রবাসী বাংলাদেশি, শ্রমজীবী মানুষ ও বুদ্ধিজীবীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই গড়া যাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্মানজনক বাংলাদেশ।


No comments