Header Ads

সীমাহীন লুটপাটে বিলীন হওয়ার পথে: সিলেটের সাদা পাথর

                                     

সীমাহীন লুটপাটে বিলীন হওয়ার পথে: সিলেটের সাদা পাথর

 


সিলেটের পাথর রাজ্যে এখন আর পাথর নেই। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এক বছর আগেও যেখানে পাথরের স্তুপ ছিল, এখন ধুধু মাঠ দেখা যাচ্ছে। দিনরাত শত শত নৌকা দিয়ে প্রকাশ্যে বালু-পাথর লুটপাট চলছে, কিন্তু প্রশাসন নিরব। বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান একাধিকবার এই পরিস্থিতির প্রতি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।

কালবেলা এ নিয়ে প্রথম থেকেই সংবাদ প্রকাশ করে লুটপাটের চিত্র তুলে এনেছে। সাদাপাথরের পাথর লুটপাটে বিএনপি, যুবদল, জামায়াত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও জড়িত ছিলেন। সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের চারপাশে বিজিবির চারটি ক্যাম্প ও চেকপোস্ট থাকা সত্ত্বেও কেউ এগিয়ে আসেনি। মাঝে মাঝে অভিযান হলেও আগেভাগেই খবর পেয়ে লুটেরা পালিয়ে যেত।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে নির্বিচারে সাদাপাথরের পাথর লুট হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে শেষ হয়ে আসা পাথরের জন্য লুটেরা মরণপণ লড়াই করেছে। এ লুটপাটে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ছিলেন তাদের নেপথ্য কারিগর।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ধলাই নদীর উৎসমুখ থেকে শত শত নৌকা পাথর লুট করছে। মূল স্পটের বাম পাশে বড় বড় পাথর নেই, কোথাও কোথাও বালুচর দেখা যাচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ি করে বড় বড় গর্ত হয়েছে। ছোট-বড় পাথর সব লুট হয়ে গেছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে পাথর নিয়ে যাওয়ার পরও বিজিবি, পুলিশ, প্রশাসন নিরব দর্শক। পাথর বোঝাই নৌকার মাঝখানে পর্যটকবাহী নৌকাও ঝুঁকি নিয়ে চলছে। ফলে পাথর রাজ্যের সৌন্দর্য হারিয়েছে এবং পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করেও ফল পাননি; বরং লুটেরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হচ্ছে।

এলাকাবাসী জানান, দেশের পর্যটকদের কাছে পরিচিত সাদা পাথর পর্যটন স্পটটি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাবে।

স্থানীয়রা বলেন, প্রশাসনের উদাসীনতা ও দুর্বল নজরদারির কারণে পাথরখেকোরা নির্বিঘ্নে তাদের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে অভিযান হলেও সাময়িক প্রভাব ছাড়া কিছু হয় না।

পরিবেশকর্মীরা অভিযোগ করেন, গত এক বছরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে, যার আনুমানিক বাজার মূল্য দুইশ কোটি টাকারও বেশি।

লাউয়াছড়া বন ও জীববৈচিত্র রক্ষা আন্দোলন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক এস কে দাস সুমন কালবেলাকে বলেন, দেশের বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র দীর্ঘদিন ধরে হুমকির মুখে রয়েছে। সাদাপাথর যেখানে সিলেটের সুনাম বাড়িয়েছিল, সেখানে ভয়াবহ লুটপাট ও দখলের কারণে সৌন্দর্য হারিয়েছে। প্রশাসনের তদারকি ও সরকারের অবহেলায় এই ধ্বংস হয়েছে। তারা সাদাপাথর ধ্বংসে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

সিলেটের পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম বলেন, প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কারণে সাদাপাথর শেষ হয়ে গেছে। বিগত এক বছর ধরে অসংখ্য প্রতিবেদন ও সতর্কতা উপেক্ষিত হয়েছে। ধলাই নদীর উৎসমুখে পাথরের সৌন্দর্য এখন ধূলো-ময়লা বালুচর হয়ে গেছে। পাথর খেকোদের খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মরণফাঁদ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং খনিজ সম্পদ বিভাগের কার্যক্রমে ব্যর্থতায় সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের শিকার হয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি উজায়ের আল মাহমুদ আদনান জানান, সাদাপাথর নিয়ে ১৫টি মামলা হয়েছে এবং প্রায় ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই লুটপাট ঠেকাতে বড় ধরনের অভিযান দরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, সাদাপাথর জাফলংয়ের মতো ইকোলজিক্যালি সংরক্ষিত এলাকা নয়, তাই সেখানে অভিযান চালানো কঠিন। যদিও জাফলংয়ে ১২টির বেশি মামলা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসনের টাস্কফোর্সের সঙ্গে সহযোগিতা করা হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এই লুটপাট হয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। সচেতন নাগরিকদেরও আরও সক্রিয় হতে হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এ লুটপাটে জড়িত।

বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকী বলেন, লুটপাটকারীরা কোনো দল নয়। তারা প্রশাসনকে বারবার বলেছে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে। তিনি প্রশাসনের দায়ী করে বলেন, যদি পাথর উত্তোলন প্রক্রিয়াগতভাবে হতো, আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হত না।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহমুদ মুরাদ বলেন, সাদাপাথরে লুটপাট বন্ধে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। প্রায় প্রতিদিন অভিযান চলছে এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

No comments

Powered by Blogger.