কিভাবে দেশ, মাটি ও মানুষের নেতা হলেন আখতার হোসেন
আখতার হোসেন একজন দৃঢ়চেতা ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিক, যিনি ছাত্রাবস্থাই থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লড়াই করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকেই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। ২০১৮ সালে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্নফাঁসের ঘটনা নিয়ে অনশন ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সবাইকে সচেতন করেন। তার এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে প্রশাসন বিতর্কিত ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি সমাজসেবা সম্পাদক পদে ছাত্রলীগ সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন, যা একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত ছিল। ২০২১ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শিক্ষার্থী ও জনস্বার্থে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেকে একজন আদর্শ ও কার্যকর নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে দীর্ঘ ৩৬ দিনের ঐতিহাসিক কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি নির্দলীয় ছাত্র সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’র আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন, যা তাকে ছাত্রজনতার আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করে তিনি রাজনীতিতে ভিন্ন এক পরিচিতি গড়ে তুলেছেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন।
আখতার হোসেন রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের সদরা তালুক গ্রামের আব্দুস সালাম ও রোকেয়া বেগমের সন্তান। তিনি রংপুরের ভায়ারহাট পিয়ারিয়া ফাযিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল এবং ধাপ-সাতগড়া বায়তুল মুকাররম মডেল কামিল মাদ্রাসায় আলিম সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে আসা এই তরুণ বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক সংগঠনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতার পথ ছিল কুসুম-কোমল নয় আখতার হোসেনের জন্য। একাধিকবার জেল-জুলুম, হামলা, মামলা, নির্যাতন ও প্রাণহানির শঙ্কার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। তবুও দৃঢ় হয়ে লড়াই করেছেন এবং দেশের মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীন ঘটনা, নির্যাতন, কারাবাস ও মুক্তি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতাগুলো স্মৃতিচারণ করেছেন।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’র প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক আখতার হোসেন বলেন, ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাবিসহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই আন্দোলন ছিল গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক দাবি-আন্দোলন। শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ কোটা বাতিল চাননি, বরং যুগোপযোগী সংস্কারের দাবি করেছিলেন। কারণ অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কিছু অংশে কোটা সংরক্ষণের যৌক্তিকতা তখনো ছিল।
তবে সরকার ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে কোটা পুরোপুরি বাতিলের ঘোষণা দেন এবং পরবর্তীতে সেটি পরিপত্র আকারে জারি করে। তখনই আন্দোলনকারীদের মধ্যে আশঙ্কা হয়, উচ্চ আদালতে রায় ভিন্ন হতে পারে, যা বাস্তবও হয়।
২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ২০১৮ সালের বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারে সামান্য চিড় ধরেছিল, যা তারা দ্রুত সারিয়ে নেয়। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয় এবং সেটাই ২০২৪ সালে সারাদেশে ফিরে আসে। একই পন্থায় হাইকোর্টে রিট করে কোটা ব্যবস্থা আবার ফিরিয়ে আনা হয়।
আন্দোলনের শুরুতে তিনি সরাসরি সামনের সারিতে না থেকে পেছন থেকে কাজ করার কথা জানান। কারণ, তার দীর্ঘদিনের পরিচিতি ছিল ছাত্রলীগবিরোধী, ভারতবিরোধী ও সরকারের সমালোচক হিসেবে। সরাসরি অংশ নিলে সরকার রাজনৈতিক রঙ দেওয়ার সুযোগ পেত। তাই তিনি বিক্ষোভে সরাসরি না গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাবির বটতলায় একটি খোলা সভায় পাশে অবস্থান করেন।
আন্দোলন সংগঠনের অভিজ্ঞতা তিনি বর্ণনা করে বলেন, জুন মাস থেকেই ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু হয়। ঈদের কারণে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকলেও তারা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়, যাতে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন একযোগে সংগঠিত করার জন্য তারা কাঠামো তৈরি করেন।
জুলাই মাসে আন্দোলন সর্বাত্মকভাবে শুরু হয়। ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। তবে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হল গেটের সামনে অবস্থান নিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতো। শুরুর মিছিলগুলো হল এলাকা অতিক্রম করে রাজু ভাস্কর্যের দিকে যেত এবং এক পর্যায়ে শাহবাগে অবস্থান গ্রহণ শুরু হয়।
অবস্থান থেকে অবরোধ কর্মসূচির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি শাহবাগ থেকে শুরু করে ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়, ফার্মগেট এবং এক্সপ্রেস হাইওয়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
১৪ জুলাই শেখ হাসিনা এক প্রেস কনফারেন্সে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি/বংশধর’ বলে হেয়প্রতিপন্ন করলে ঢাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্ররা ‘তুমি কে? আমি কে? — রাজাকার! রাজাকার!’ স্লোগান দিতে শুরু করে। নারী শিক্ষার্থীরা রাতের বেলায় হল থেকে বেরিয়ে আসে এবং ছাত্ররাও রাজু ভাস্কর্যের দিকে ছুটে যান।
ওই রাতে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়, যা ঠেকানো হয়। পরের দিন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলায় শিক্ষার্থীরা আহত হন, নারী শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত হন এবং মিছিল স্থগিত হয়।
১৬ জুলাই শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন তারা। সেই সময় রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের গুলিতে নিহত হওয়ার খবর আসে, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে দুঃখ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে। রাতেই জানা যায় পুলিশের গুলিতে আরও ছয়জন নিহত হয়েছেন।
ঢাবিতে গায়েবানা জানাজার চেষ্টা হলেও গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতির কারণে মরদেহ ক্যাম্পাসে আনা সম্ভব হয়নি। পুলিশ ক্যাম্পাস প্রবেশ নিষিদ্ধ করে, তবে আখতার হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে রাজু ভাস্কর্যের সামনে যান এবং জানাজার আভাস দেন।
গ্রেফতারকালে পুলিশ তাঁকে ঘিরে ফেলে ক্যাম্পাস থেকে বের হতে বললে তিনি প্রতিবাদ করেন। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং আখতার সহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তাকে চ্যাংধোলা করে প্রিজন ভ্যানে ওঠানো হয়। পরে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং দুই দিনের রিমান্ডে রাখা হয়।
জেলখানার প্রথম দিনগুলো কঠিন ছিল। তাদেরকে ছোট ছোট কনডেম সেলে আটক রাখা হয়, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নিষিদ্ধ ছিল। বন্দিদের মধ্যে অনেক শিশু ছিল, যারা মারাত্মক অবস্থায় জেলখানায় ছিল। খবর পেতে পারতেন না, পরিবারের অবস্থাও জানতেন না।
৫ আগস্ট জানতে পারেন শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন বলে গুজব ছড়ায়। জেলখানায় বন্দিরা আনন্দ ও উল্লাসে মেতে ওঠে। বন্দিদশার মাঝেও তারা লেখালেখি ও সংলাপ চালিয়ে নিজেদের শক্ত রাখেন।
মুক্তির সময় তাকে রাত ১১টার দিকে জেল থেকে বের করা হয়। সেই সময় ভয় ছিল, কারণ দেশে জেলহত্যার ইতিহাস আছে। তবে তখন দেখতে পান কারারক্ষী ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এবং টিভিতে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর দেখানো হচ্ছিল।
আন্দোলনে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের বিষয়ে আখতার বলেন, ১৬ জুলাই ঢাবির ছাত্ররা হল থেকে ছাত্রলীগ বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়, যা ছাত্র সমাজকে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। এছাড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়।
তিনি বলেন, এই আন্দোলনে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্রিত হয়েছিল একটি লক্ষ্যের জন্য — বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করা। এ ধরনের বিস্তৃত অংশগ্রহণ আগে কখনো দেখা যায়নি।
আন্দোলনের নেতৃত্বে কেউ একক ছিলেন না, অনেকেই বন্দি বা গুম হয়েছেন। সম্মিলিত অংশগ্রহণের কারণে সরকার তা দমন করতে পারেনি।
বাংলাদেশের মানুষ গুম, খুন, নির্যাতন ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে আওয়ামী লীগের প্রতি তীব্র ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। প্রতিদিন রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা মানুষ হত্যা করছে। এই নির্মমতার কারণে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে।
বিপদের মুহূর্তে অপরিচিতরা পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়েছে, আহতদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। এটি জাতিকে একসূত্রে বেঁধেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের মানুষ আর কোনো স্বৈরাচারী শাসক সহ্য করবে না — এ আন্দোলন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আখতার হোসেনের মতে, এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন জনগোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে — প্রতিবাদী, সাহসী এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি জাতির জন্য এক বড় অর্জন।


No comments