দুর্বল ৫ ব্যাংক একীভূত হয়ে গড়ে উঠছে শক্তিশালী সরকারি ইসলামী ব্যাংক
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, মালিকপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতটাই আর্থিক দুর্বলতায় পড়েছে যে স্বতন্ত্রভাবে টিকে থাকা তাদের জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে—দেশের পাঁচটি বেসরকারি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে একটি বৃহৎ, শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামি ব্যাংক গঠন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সরকারের মূলধন সহায়তা পেলেই সপ্তাহখানেকের মধ্যে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। এর লক্ষ্য দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করা, খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যবস্থাকে সংস্কার করা এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।
নতুন ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে। এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) অর্থায়নে বিশেষায়িত হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি লাইসেন্সে কার্যক্রম চালাবে। একীভূত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সম্পদ, আমানত, দায়ভার এবং কর্মীবাহিনী নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে আসবে।
ভয়াবহ খেলাপি ঋণের চিত্র
গভর্নরের মতে, গত এক বছরে তিনি ১২টি দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে সম্পদ মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়া এই পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৮% থেকে ৯৬%। যেখানে ব্যাংকিং খাতের গড় খেলাপি ঋণ সরকারি হিসাবে ৯-১০%। এই বৈষম্য পরিস্থিতির গভীর সংকট তুলে ধরে।
তিনি বলেন, দেশের ১২ থেকে ১৩টি ব্যাংক লুটপাটের শিকার হওয়ায় এগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এজন্য প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার প্রক্রিয়াধীন।
নতুন ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না হলে তা তিন মাসের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ হবে—আগের নিয়মে যা ছিল ছয় মাস থেকে এক বছর।
গভর্নরের দাবি, যেসব ব্যাংকের বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল, তারা বড় সংকটে পড়েনি। তাই সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। যেসব ব্যাংক নিজস্ব উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তাদের একীভূত করা হবে। ইসলামী ব্যাংক ও ইউসিবি ইতোমধ্যে দুর্বল অবস্থা কাটিয়ে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে এসেছে।
তবে কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০% থেকে ৯৫% হওয়ায় সেগুলোর স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ নেই। আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এসব ব্যাংককে মার্জারের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথমে সরকারি ব্যাংকের মতো কিছু সময় পরিচালনা করে পরে আবার বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে আনা হবে। পুনর্গঠনের পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা শেয়ার কিনতে পারবেন।
কেন এই অবস্থা
মালিকপক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জামানত বা যথাযথ যাচাই ছাড়াই অসংখ্য ঋণ দিয়েছে। বড় ঋণগ্রহীতারা অর্থ তুলে বিদেশে পাচার বা অন্য খাতে ব্যবহার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা বিদ্যমান ছিল।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
গভর্নর বলেন, “আমানতকারীদের কোনও ঝুঁকি নেই। সরকার প্রাথমিকভাবে মূলধন দেবে, পরে ব্যাংক লাভজনক হলে সেই অর্থ লাভসহ ফেরত নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে নতুন ব্যাংক দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রির সম্ভাবনাও রয়েছে।
শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বণ্টন পদ্ধতি
একীভূত হওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারমূল্য ও অভিহিত মূল্যের গড় হিসেবে নতুন ব্যাংকের শেয়ার পাবেন। উদাহরণস্বরূপ—এক্সিম ব্যাংকের ১০০ শেয়ার (অভিহিত মূল্য ১০ টাকা, বাজারমূল্য ২ টাকা) হলে মোট বাজারমূল্য হবে ২০০ টাকা। অন্যদিকে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ২০০ শেয়ার (বাজারমূল্য ৩ টাকা) হলে মোট বাজারমূল্য হবে ৬০০ টাকা। এই হিসাবে নতুন ব্যাংকে শেয়ার বণ্টন হবে ১:৩ অনুপাতে।
প্রথমদিকে লভ্যাংশ দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। অগ্রাধিকার থাকবে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
চাকরি ও গ্রাহক সুরক্ষা
শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও অন্যান্য কর্মীর চাকরি অন্তত তিন বছর অক্ষুণ্ণ থাকবে। গ্রাহকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ব্যাংকের গ্রাহক হবেন এবং লেনদেনে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বোর্ড পরিবর্তন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এই পাঁচ ব্যাংকের নতুন বোর্ড নিয়োগ দেয়। এক্সিম ব্যাংকের মালিক ছিলেন আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ নজরুল ইসলাম মজুমদার, আর বাকি চারটির মালিকানা ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপের। আগের সরকারের সময়ে অনিয়ম ও বিপুল অর্থ উত্তোলনের কারণে এসব ব্যাংক আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে। বর্তমানে এস আলম গ্রুপ মালিকানাধীন একটি ইসলামী ব্যাংকের ৮২% শেয়ার বিক্রির চেষ্টা চলছে, যা সফল হলে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি পূরণ করা হবে।
সামনে আরও একীভূতকরণ
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই পাঁচ ব্যাংকের বাইরে আরও অন্তত ২০টি ব্যাংক—সরকারি ব্যাংকসহ—ভবিষ্যতে একীভূত করার পরিকল্পনা আছে। তবে কোনো ব্যাংক বন্ধের পরিকল্পনা নেই। লক্ষ্য দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
একের মাধ্যমে একটি বৃহৎ সরকারি ইসলামি ব্যাংক গঠিত হলে এসএমই খাতে অর্থায়ন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরতে পারে। তবে ঝুঁকিও রয়েছে—যদি রাজনৈতিক প্রভাব ফিরে আসে, তদারকি দুর্বল হয় বা সরকারি মূলধন অপচয় হয়, তবে উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতকে নতুনভাবে সাজানোর বড় সুযোগ। তবে সফলতা নির্ভর করবে সঠিক তদারকি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনার ওপর। শর্তগুলো পূরণ হলে নতুন ইসলামি ব্যাংক সংকট কাটিয়ে দেশের আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার প্রতীক হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগ শুরুর দিকে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও নীতিগত অস্থিরতার কারণে ব্যাহত হয়েছিল। খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশে আধুনিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের চেষ্টা হলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো পুনরুদ্ধারমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “যদি সরকার অন্তত এক-দুটি বড় সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক সঠিকভাবে পুনর্গঠন করতো, সেটাই হতো একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত।


No comments