মূলধন সংরক্ষণে দক্ষিণ এশিয়ার তলানিতে বাংলাদেশ
দীর্ঘদিনের লুটপাট, অনিয়ম, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। ঋণের নামে বিপুল অর্থ উত্তোলন হলেও তার বেশিরভাগই আর ফেরত আসেনি। পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ মূলধন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৪-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (Capital Adequacy Ratio - CAR) নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে এ হার ছিল ১১.৬৪ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৩.০৮ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতন দেশের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণে উন্নতি করেছে। উদাহরণ হিসেবে, শ্রীলঙ্কা একসময় দেউলিয়াত্বে পড়লেও বর্তমানে ব্যাংক খাতে ১৮.৪ শতাংশ মূলধন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা অঞ্চলটির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পাকিস্তান ২০.৬ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করে শীর্ষ স্থানে আছে এবং ভারত ১৬.৭ শতাংশ মূলধন ধরে রেখে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের প্রতিবেদনগুলোতেও দেখা যায়, ২০২১ সালে মূলধন সংরক্ষণের হার ছিল ১১.০৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৮৩ শতাংশে। কিন্তু ২০২৪ সালে হঠাৎ করেই তা নেমে আসে ৩.০৮ শতাংশে, যা ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থার প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খেলাপি ঋণই এ পরিস্থিতির মূল কারণ। ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়ে অর্থ ফেরত পাচ্ছে না, ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ক্রমেই বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে মূলধনে, আর মূলধন কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও পুনঃবিনিয়োগের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের সিএআর (CAR) অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভারত তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর অর্থনৈতিক সংকেত বহন করছে। শুধু ব্যাংক খাতই নয়, এ দুরবস্থার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও পড়ছে। ঋণ ফেরত না আসা এবং ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক অবস্থা ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের ব্যাংক খাতের মূলধন সংরক্ষণ ২০২২ সালে ছিল ১৬.৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৭ শতাংশ, আর ২০২৪ সালে তা পৌঁছায় ২০.৬ শতাংশে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৬.২ শতাংশ, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় ১৮.৪ শতাংশে। ভারতের ব্যাংক খাতে ২০২২ সালে মূলধন পর্যাপ্ততা ছিল ১৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে বেড়ে হয় ১৬.৮ শতাংশ, আর ২০২৪ সালে সামান্য কমে ১৬.৭ শতাংশে নেমে আসে।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর গবেষক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, “ব্যাংক খাতের এ সংকট দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি। মূলধন ঘাটতি বিনিয়োগের সক্ষমতা হ্রাস করছে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দুর্নীতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বল নজরদারিই এ অবস্থার জন্য দায়ী। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো যখন ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করছে, তখন বাংলাদেশকে দ্রুত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা না আনতে পারলে এ সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।


No comments