চলতি বছর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট হবে না
চলতি বছরে নতুন করে গ্রাহকদের হাতে আর স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স দিতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। কারণ, লাইসেন্স প্রিন্টের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ পেতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে। এই সময়ে কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট হবে না।
বর্তমানে বিআরটিএতে প্রায় সাত লাখ লাইসেন্স ছাপার অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী ছয় মাসে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে, কারণ লাইসেন্স ছাপানো বন্ধ থাকলেও আবেদন গ্রহণ চলবে। তবে বিআরটিএ জানিয়েছে, কার্ডে লাইসেন্স প্রিন্ট না হলেও ই-লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং পুলিশ যেন ই-লাইসেন্সকে গ্রহণ করে, সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
বিআরটিএর এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবে মন্ত্রণালয় কেন আপত্তি জানিয়েছে তা জানা নেই, যদিও অতীতে সেনাবাহিনীর কাছে এই দায়িত্ব ছিল। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে ছয় মাসের আগে শেষ হবে না।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন জানান, চুক্তি চলমান থাকাকালে নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিলে পুরোনো প্রতিষ্ঠানের কাজের গতি কমে যেত। তাই তাদের কাজ শেষ করতে সময় দেওয়া হয়েছে। আপাতত লাইসেন্স প্রিন্ট বন্ধ থাকলেও ই-লাইসেন্স প্রদান অব্যাহত থাকবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় ই-লাইসেন্সকে বৈধ করা হয়েছে।
এতদিন ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টের দায়িত্বে ছিল ভারতের মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেড (এমএসপি)। ২০২০ সালের ২৯ জুলাই থেকে পাঁচ বছরের জন্য তারা এই দায়িত্বে ছিল। গত ২৮ জুলাই চুক্তি শেষ হওয়ায় ২৯ জুলাই থেকে প্রিন্টিং, বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ সব কার্যক্রম বন্ধ। শুরুতে এমএসপিকে নিয়মিত আবেদনের কাজ করতে বলা হয় এবং পুরোনো আবেদনের জট কাটাতে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা সেনাবাহিনী পরিচালনা করে।
সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, “অনিবার্য কারণে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিং কার্যক্রম বন্ধ আছে” — এমন নোটিশ টাঙানো রয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া স্মার্ট কার্ড দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে লাইসেন্স-সংক্রান্ত ডাটাবেজ ও সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে, যেখানে বিআরটিএর নিজস্ব প্রবেশাধিকার নেই। এই বিষয়টি উদ্বেগজনক। বিআরটিএ জানিয়েছে, আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ডাটাবেজ ও সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ জানান, ঠিকাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় উন্মুক্ত দরপত্রে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। গ্রাহকদের আপৎকালীন সেবা দেওয়ার জন্য পরিকল্পনাও তৈরি হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী এমএসপিকে পাঁচ বছরে ৪০ লাখ লাইসেন্স কার্ড সরবরাহ করতে হতো, যার মধ্যে ৫০ হাজার পেশাদার এবং ৫০ হাজার অপেশাদার লাইসেন্সের কার্ড মজুত রাখতে হতো। চুক্তির মূল্য ছিল ১২০ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি কার্ডের দাম প্রায় ৩০০ টাকা। বিআরটিএর তথ্যানুসারে, এই সময়ে ৩৩ লাখ আবেদন জমা পড়ে, যার মধ্যে প্রায় ২৬ লাখ গ্রাহক লাইসেন্স পেয়েছেন এবং সাত লাখ এখনও পাননি।
বিআরটিএর এক সূত্র জানায়, এমএসপি কখনোই চুক্তি অনুযায়ী সেবা দিতে পারেনি। কার্ডের সংকট ছিল নিয়মিত, ফলে সময়মতো লাইসেন্স সরবরাহ সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন ৮ হাজার কার্ড সরবরাহের লক্ষ্য থাকলেও তা কখনো পূরণ হয়নি।
২০১১ সালে বিআরটিএ চিপযুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স চালু করে। শুরুতে টাইগার আইটি এই প্রকল্পে যুক্ত ছিল। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আবারও টাইগার আইটি দায়িত্বে থাকলেও, বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকায় থাকায় ২০১৯ সালের আগস্টে তাদের চুক্তি বাতিল হয়। এরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগ হলেও ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত টাইগার আইটি স্মার্ট কার্ড সার্ভার ও ডাটাবেজ হস্তান্তরে গড়িমসি করে, ফলে প্রায় ১২ লাখ ৪৫ হাজার আবেদন ঝুলে থাকে। এবারও এমএসপি একইভাবে ডাটাবেজ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে চুক্তি শেষ করেছে।
বুয়েটের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ শামছুল হক বলেন, বিআরটিএর অপেশাদার আচরণের কারণে বছরের পর বছর লাইসেন্স সংকটের সমাধান হয়নি। দায়িত্বশীলরা সুবিধা ভোগ করলেও কোনো জবাবদিহি নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।


No comments