জামায়াত-এনসিপির শর্তে চাপের মুখে বিএনপি, নির্বাচন নিয়ে নতুন শঙ্কা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি বিভিন্ন শর্তের সঙ্গে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভোটের সুনির্দিষ্ট সময় ঘোষণা এবং প্রস্তুতির কথা বলা হলেও, সেই নির্বাচনকে ঘিরে সন্দেহ, সংশয় ও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কারণ, সংস্কার প্রস্তাবের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও অন্যান্য ইস্যুতে শর্ত চাপিয়ে জামায়াত ও এনসিপি এখন বিএনপির বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ও বিভাজন বাড়ছে।
বিবিসি বাংলার বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা মনে করছেন, সংস্কার ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের বিষয় অগ্রাহ্য করে একটি “সাজানো” নির্বাচন করা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, জামায়াত ও এনসিপি তাদের দাবির বাস্তবায়নে কতদূর যেতে পারে এবং তারা নির্বাচন বর্জনের মতো অবস্থান নেবে কি না। এছাড়া এই শর্তগুলো বিএনপিকে কী ধরনের চাপে ফেলতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে ভোটের রাজনীতিতে এনসিপি এককভাবে কোনো আসনে জেতার শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। এজন্য নিজেরা যখন চাপ অনুভব করছে, তখন তারা বিভিন্ন দাবি বা শর্ত তুলে সরকার ও অন্য দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের মধ্যে কেউ মনে করেন, ভোটে সম্ভাবনা তৈরি না হওয়ায় আসন নিয়ে সমঝোতা বা দরকষাকষির মাধ্যমে বিএনপির ওপর চাপ দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করতে পারে এনসিপি। যদিও দলটির নেতারা এটি স্বীকার করেননি। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “সংস্কার ও বিচারের বিষয়কে পাশ কাটিয়ে এখন নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একারণে মানুষের প্রত্যাশায় চির ধরেছে।”
নির্বাচন নিয়ে জামায়াতও চাপের মধ্যে আছে। দলটির সংগঠিত শক্তি থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের সমর্থন সীমিত। অন্যদিকে, নির্বাচন ইস্যুতে সরব থাকা বিএনপির সমর্থন ব্যাপক। গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির সমর্থন আরও বেড়েছে। ভোটে অংশগ্রহণ হলে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
জামায়াত এই পরিস্থিতিতে “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” বা সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের দাবি তুলেছে। তবে তাদের আন্দোলনের পেছনে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রধান হলো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার লন্ডন বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি। জামায়াত মনে করে, এতে একটি দলের পক্ষ থেকে সরকার প্রধানের বার্তা পৌঁছেছে।
ফলে নির্বাচনের সময় ঠিক করা ও ঘোষণা করা প্রসঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার অভাবও তাদের ক্ষোভের কারণ। এছাড়া আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের বছরপূর্তিতে ৫ আগস্ট মানিকমিয়া অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশে প্রধান উপদেষ্টা জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ এবং রাতেই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা করাও জামায়াতের প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে। তারা মনে করে, নির্বাচনের পরিকল্পনা “ডিজাইনড” বা সাজানো।
জামায়াত ও এনসিপির অভিযোগ, তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডন বৈঠকের পর প্রশাসন বিএনপির প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছে। ফলে অন্যান্য দলের জন্য সমান সুযোগ নেই। তারা নির্বাচন শুরুর আগে সংবিধান, সংস্কার ও বিচারের দাবিগুলো পূরণ করতে চায়।
দুই দলই রাজপথে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিলের সম্ভাবনার কথা বলছে। যদি তাদের দাবিসমূহ পূরণ না হয়, ভোট বর্জনের মতো অবস্থান নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন বর্জন হলে সেই ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমবে এবং তা বিএনপিকে চাপের মধ্যে ফেলবে। তবে বিএনপি নেতারা মনে করেন, জামায়াত ও এনসিপির বক্তব্য মূলত মাঠের বক্তৃতা। তারা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনেই অংশ নেবে।
সরকারও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার কথা বললেও মনে হয় এখন তা হওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা নির্বাচনের তফসিল ও পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করবে, তবে সংবিধান সংস্কার বা বাস্তবায়নের দাবিদফা নিয়ে নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন শুরুর আগে কোনো দল যদি দাবিদফা নিয়ে আন্দোলন করে, তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে। জামায়াত ও এনসিপি নির্বাচনে আপত্তি না থাকলেও তাদের সংস্কারের দাবি থেকে সরার সম্ভাবনা কম। বিএনপিও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না। ফলে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যেতে পারে।
সংক্ষেপে, ভোটে ফিরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কারণে নির্বাচন অনিশ্চিত হলে দায় তাদের ওপরই বর্তাবে, যা কোনো পক্ষই নিতে চাবে না।


No comments