Header Ads

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কোথায় কমবে, রাষ্ট্রপতির কোথায় বৃদ্ধি পাবে

                                   

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কোথায় কমবে, রাষ্ট্রপতির কোথায় বৃদ্ধি পাবে



মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে যেভাবে ঐকমত্য ও ভিন্নমতসহ সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কতটা কমবে এবং সংস্কারের লক্ষ্য কতটা পূর্ণ হবে, তা নিয়ে এখনো নানা আলোচনা চলছে। যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে সেগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না, সেটাও স্পষ্ট নয়। তবে এখন পর্যন্ত যে বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত আকারে কমবে।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারসাম্য আনা। তারা বলেছিল, বর্তমান সংবিধানে কার্যকর ভারসাম্যের অভাব গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য গুরুতর হুমকি। প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ তাকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। তাই ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন ঠেকানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণই ছিল সংস্কারের লক্ষ্য।

এ জন্য কমিশন প্রস্তাব দিয়েছিল—

  • প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো,

  • সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন,

  • রাষ্ট্রপতিকে কিছু নিয়োগে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া,

  • দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু করা,

  • একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী থাকতে না পারা,

  • একই সঙ্গে একাধিক পদে না থাকা।

কিন্তু এসব প্রস্তাবের বেশ কিছুতে বিএনপিসহ কয়েকটি দল ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) দিয়েছে। তাদের মতানুযায়ী, কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নির্বাহী বিভাগ দুর্বল হয়ে যাবে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া কার্যত কোনো নিয়োগ দিতে পারেন না। কমিশনের প্রস্তাবে ছিল জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, যা নির্বাচন কমিশন, পিএসসি, অ্যাটর্নি জেনারেল, তিন বাহিনীর প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেবে। তবে পরে ঐকমত্য কমিশন নতুন প্রস্তাব দেয়—বাছাই কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ। এতে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধি থাকবেন।

ইসি গঠনে এই প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে। তবে পিএসসি, ন্যায়পাল, সিএজি ও দুদক গঠনে বিএনপিসহ কয়েকটি দল ভিন্নমত দিয়েছে। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকা
এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে সংসদ নেতা ও দলের প্রধান থাকেন। কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় তিনি আর দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না। তবে এই প্রস্তাবেও বিএনপিসহ কিছু দলের ভিন্নমত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আংশিক হ্রাস
ঐকমত্য অনুযায়ী—

  • নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রী এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। বাছাই কমিটি মনোনয়ন দেবে, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করবেন।

  • মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনে রাষ্ট্রপতি সরাসরি নিয়োগ দেবেন।

  • একজন সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন।

  • জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নয়, মন্ত্রিসভার অনুমোদনও লাগবে। সেই বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা বা তাঁর অনুপস্থিতিতে উপনেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি
ঐকমত্য কমিশন প্রথমে ১২টি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে রাষ্ট্রপতি নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে বিএনপিসহ কিছু দল গভর্নর ও এনার্জি কমিশনে রাষ্ট্রপতির সরাসরি ক্ষমতার বিরোধিতা করেছে।

সংসদে জবাবদিহি ও দ্বিকক্ষব্যবস্থা
সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে, অর্থাৎ দলগুলো যত ভোট পাবে, তত আসন পাবে। এতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা কমবে। তবে বিএনপি এই পদ্ধতির বিরোধিতা করছে; তারা নিম্নকক্ষের আসনের ভিত্তিতে বণ্টন চায়।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ আংশিক সংশোধন হয়েছে। অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এছাড়া চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হবে।

সার্বিক মূল্যায়ন
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতে, সব না হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা গেছে, ক্ষমতার কিছু অংশ কমেছে, এবং সংসদীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করার কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে আরও কিছু বিষয়ে ঐকমত্য প্রয়োজন।

No comments

Powered by Blogger.