Header Ads

নির্বাচনী ব্যবস্থার অসংগতি দূর করতে ৩টি প্রস্তাব

                                 

নির্বাচনী ব্যবস্থার অসংগতি দূর করতে ৩টি প্রস্তাব


                                


স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা কতটা সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে এবং তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে উন্নতির জন্য এখানে আমরা তিনটি প্রস্তাব দিচ্ছি। আপাতত সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো, পরে বিস্তারিত দেওয়া হবে।

১. ভোট ও আসনসংখ্যার অসংগতি কমানো
সংযুক্ত সারণিতে দেখা যায়, বিভিন্ন নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট ও আসনের মধ্যে অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ের অসংগতি রয়েছে। যেমন—২০০১ সালের নির্বাচনে দুই প্রধান দল প্রায় সমান ভোট পেলেও আসন পার্থক্য ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ। ২০০৮ সালে ভোটের পার্থক্য ছিল ১৬ শতাংশ, কিন্তু আসনের পার্থক্য প্রায় ৬৬ শতাংশ। অন্য নির্বাচনগুলোতেও একই অবস্থা দেখা যায়।

বর্তমান পদ্ধতিতে ৫০ শতাংশের কম ভোট পেয়েও, এমনকি মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানেও কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারে—এটাই এই অসংগতির মূল কারণ। দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

আমাদের প্রস্তাব হলো—বর্তমান ৩০০ আসনের পাশাপাশি আরও ৩০০ আসন যোগ করা, যা দলগুলোর সারাদেশে প্রাপ্ত মোট ভোটের অনুপাতে বণ্টন করা হবে। এভাবে ২০০১ বা ২০০৮ সালের নির্বাচনে কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেত না। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টনের এই পদ্ধতি আমাদের জন্য নতুন হলেও, বিশ্বের অনেক দেশে চালু রয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ভোটের আগে দলগুলো স্থানীয় আসনের পাশাপাশি এই অনুপাতে বণ্টনযোগ্য আসনের জন্যও ৩০০ প্রার্থীর তালিকা দেবে। ভোট শেষে প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ অনুযায়ী প্রতিটি দল তাদের তালিকা থেকে আসন পাবে।

এই ব্যবস্থার সুবিধা দুইটি—
১. স্থানীয় সমস্যা সমাধানে স্থানীয় প্রতিনিধি থাকবে, আর জাতীয় সমস্যা সমাধানে জাতীয়ভাবে দক্ষ প্রতিনিধি থাকবে।
২. অকারণ উচ্চমাত্রার সংখ্যাগরিষ্ঠতা এড়ানো যাবে, ফলে সরকারি দলের আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা কমবে।

এ মুহূর্তে সংসদে উচ্চকক্ষ চালুর প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। তবে উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব থাকলেও, মূল ক্ষমতা থাকবে নিম্নকক্ষের হাতে। নিম্নকক্ষে আগের মতোই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকলে দুর্বল গণতন্ত্র ও আধিপত্যবাদী শাসন রয়ে যাবে। উচ্চকক্ষ আমাদের দেশে জটিলতা বাড়াবে, কমাবে না।

২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে স্বচ্ছতা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা ভালো হলেও, কারা এর অংশ হবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা দেখা গেছে। ১৯৯৬, ২০০৬ ও ২০১৪-এর পর থেকে এর ফলে নানা রাজনৈতিক সংঘাত হয়েছে। দলগুলো বহুবার রুদ্ধদ্বার আলোচনায় বসেছে, কিন্তু তা জনসমক্ষে আনা হয়নি। কোন দল আলোচনায় অংশ নেবে, সেটিও স্পষ্ট ছিল না।

বর্তমান সংবিধান সংস্কার কমিশন ১৯৯৬ সালের মতোই প্রস্তাব দিয়েছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হবেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি; তিনি না পারলে আগের জন, তারপর ক্রমান্বয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা। কিন্তু উপদেষ্টা কারা হবেন, তা স্পষ্ট নয়।

আমাদের প্রস্তাব—পুরো প্রক্রিয়া জনসমক্ষে আনতে হবে। বিগত নির্বাচনে ন্যূনতম ভোট পাওয়া প্রধান দলগুলো থেকে অনাপত্তিকৃত নামের তালিকা নেওয়া হবে, যেখানে বিচারপতির পাশাপাশি অন্যান্য পেশাজীবীর নামও থাকবে। সব তালিকায় যে নামগুলো মিলবে, সেগুলো থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্ধারণ হবে।

একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকলে যাঁদের তালিকায় অবস্থান আগে, তাঁরা অগ্রাধিকার পাবেন। প্রক্রিয়াটি জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা উচিত, যাতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্ন তালিকা দিয়ে প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার চেষ্টা জনগণের সামনে ধরা পড়ে।

যদি তালিকায় কোনো মিল না থাকে, তবে তুলনামূলক কম ভোট পাওয়া দলগুলোকে একে একে বাদ দিয়ে অন্তত প্রধান দুটি দলের মিলিত তালিকা থেকে নাম বেছে নেওয়া হবে। একই পদ্ধতিতে সরকার উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও কমিশনারদেরও নির্বাচন করা যাবে।

এভাবে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হবে এবং জনগণ জানবে কীভাবে উপদেষ্টাদের বেছে নেওয়া হলো।

৩. আসনসংখ্যা ও বণ্টনের যৌক্তিকতা
বর্তমানে সংসদে মোট ৩০০ আসন রয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের আসনসংখ্যা থেকে এসেছে। কিন্তু এর পেছনে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য, উপাত্ত বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই। আগে ‘নির্বাচনী এলাকা সীমানা নির্ধারণ আইন’ ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল—আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা বণ্টনের ভিত্তিতে আসন নির্ধারণ করা হবে, ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রেখে।

কিন্তু আসলে কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া উচিত—জনসংখ্যা, ভূমির পরিমাণ, নাকি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমাদের পরীক্ষণে দেখা গেছে, বর্তমান আসন বণ্টন জনসংখ্যা, ভূমির পরিমাণ বা ঘনত্ব—কোনোটির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

উদাহরণ—ঝালকাঠির এক আসনে ভোটারসংখ্যা ১.৭৯ লাখ, অথচ ঢাকার এক আসনে ৭.৫ লাখ। ২০০৮ সালের আসন বণ্টন নিয়েও ব্যাপক অভিযোগ ছিল, কিন্তু সীমানা বা বণ্টন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

জনসংখ্যা অনুযায়ী বণ্টন হলে ঝালকাঠি, মেহেরপুর ও নড়াইলের ২ আসনের বদলে ১টি করে আসন হওয়া উচিত, আর গাজীপুরের ৫ আসনের বদলে ১০টি আসন হওয়া উচিত।

আমাদের প্রস্তাব—আসন বণ্টন জনসংখ্যা ঘনত্বের সঙ্গে সমানুপাতিকভাবে করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভূমির পরিমাণ ও জাতীয় রাজস্বে অবদান—দুটোকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

স্বাক্ষর
শতাব্দ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়;
মু আ হাকিম নিউটন, ইউনিভার্সিটি অব নিউ ক্যাসেল, অস্ট্রেলিয়া;
ফারজানা আলম, ইউনিসেফ লিডারশিপ প্রোগ্রাম;
মোহাম্মদ কায়কোবাদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো

মতামত লেখকদের নিজস্ব।

No comments

Powered by Blogger.