ভূমি ও সম্পদের টেকসই ব্যবহারে ৩০ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর দেশের ভূমি ও সম্পদের সঠিক ও সুষ্ঠু ব্যবহারে ‘জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ৩০ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমি, ভূগর্ভস্থ অঞ্চল, আকাশ, সমুদ্রসহ দেশের আঞ্চলিক উন্নয়নের সার্বিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হবে।
সম্প্রতি একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রকল্পটির খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০০ কোটি টাকা।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি জনসংখ্যার সুষম বণ্টন ও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে। পরিকল্পনাটি জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় তিন স্তরে কাঠামোবদ্ধভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমি সংরক্ষণ, ব্যবহারের শ্রেণিবিন্যাস এবং জাতীয় খাতভিত্তিক নীতিমালার সঙ্গে সমন্বিত আঞ্চলিক পরিকল্পনা প্রণয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ পরিকল্পনায় দেশের সীমান্ত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মাথায় রেখে অর্থনৈতিক করিডোর, নিরাপত্তা, সড়ক, রেল এবং জলপথের সংযোগ স্থাপনের বিষয়েও কৌশল নির্ধারণ করা হবে।
জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ-১৫-এ গৃহীত 'কুনমিং-মন্ট্রিল গ্লোবাল বায়োডাইভারসিটি ফ্রেমওয়ার্ক' চুক্তির আলোকে এই জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংযুক্ত একটি জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামো তৈরি, ২০২৮ সালের মধ্যে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনায় তা একীভূত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পরিকল্পনা প্রণয়নে নানা সভা, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ জুলাই ‘জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ১৭ জুলাই মন্ত্রণালয় প্রকল্পটির খসড়া অনুমোদন দেয়।
প্রকল্প খসড়া অনুযায়ী, জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার আওতা দেশব্যাপী বিস্তৃত হবে। ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ২০২৫ থেকে ২০৫৫ সাল পর্যন্ত এই ৩০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পর্যালোচনার আওতায় আসবে।
পরিকল্পনায় গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিরূপণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৫০ ও ২১০০ সালের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রক্ষেপণ মাথায় রেখে তৈরি করা হবে বন্যার ঝুঁকির মানচিত্র। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি নির্ধারণে অতীতের ঢেউ, জোয়ার ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
এ ছাড়া দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক একটি ব্যবহারকারীবান্ধব ওয়েব-জিআইএসভিত্তিক ড্যাশবোর্ড তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিপ্রধান ও ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে কৃষিজমির প্রতি ইঞ্চি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তবে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে প্রতি বছর গড়ে ০.১৯ শতাংশ হারে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে, যা ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
তবে দেশের জিডিপিতে নগর এলাকার অবদান উল্লেখযোগ্য। গত এক দশকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ৬ শতাংশের বেশি। বর্তমানে নগরগুলো দেশের জিডিপির প্রায় ৬৫ শতাংশ অবদান রাখছে, এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,২৬৫ জন মানুষ বসবাস করে। এই ঘনবসতি ও নগরায়ণের বাস্তবতায় টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি এবং নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, "স্বাধীনতার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিকীতে (১৯৭৩-১৯৭৮) স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। এর ফলে এক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের সঙ্গে অন্য মন্ত্রণালয়ের কোনো সমন্বয় থাকেনি। তাই সরকার যে নতুন করে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার উদ্যোগ নিয়েছে, তা সময়োপযোগী। তবে দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করা জরুরি, যাতে দেশের ভূমি, সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ করা যায়।"
এ বিষয়ে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক মাহমুদ আলী বলেন, “ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়ণের কারণে কৃষিজমি রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, ২০২৮ সালের মধ্যে আমরা কুনমিং-মন্ট্রিল চুক্তির আলোকে পরিকল্পনা ও আইন প্রণয়ন করতে পারব।”
সারসংক্ষেপে:
বাংলাদেশ এখন একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, যা দেশের টেকসই উন্নয়ন ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


No comments