জুলাই অভ্যুত্থান থেকে এনসিপির সূচনা
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র-জনতার টানা আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন সূর্যের উদয় হয়। স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের শীর্ষ সমন্বয়করা উপলব্ধি করেন—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন বিকল্প শক্তির প্রয়োজন। পুরোনো ধাঁচের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে গণমুখী ও অংশগ্রহণমূলক নতুন রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রয়োজনীয়তা তখন প্রবল হয়ে ওঠে। এ ভাবনা থেকেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একদফা ঘোষণার ধারাবাহিকতায় তারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথে হাঁটেন। প্রথমে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি, যা পরে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে।
অভ্যুত্থানের শক্তিকে সংহত করে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর অভ্যুত্থানের নেতাদের উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক কমিটির যাত্রা শুরু হয়—যা ছিল দল গঠনের প্রথম ধাপ। কমিটির মূল লক্ষ্য ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন। এরপর ২ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করে।
পরে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি যৌথ সিদ্ধান্তে আসে। ৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে তারা ঘোষণা দেয়—নতুন রাজনৈতিক দল আসছে। লিখিত বক্তব্যে তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী লীগের পতন ঘটে এবং অভ্যুত্থানের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ফ্যাসিবাদী উপাদান তখনও রাষ্ট্র কাঠামোতে রয়ে গেছে। একদফার মূল লক্ষ্য—ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং সাম্য, মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের বাংলাদেশ গড়া—এখনও অসমাপ্ত।
তাদের মতে, ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৯০-এর অভ্যুত্থান—প্রতিটি সময়েই জনগণ জুলুম-শোষণহীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নতুন করে সেই সুযোগ এসেছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের নতুন রাষ্ট্রকল্প ও আকাঙ্ক্ষা পুরোনো দলগুলো ধারণ করতে পারেনি। তাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র-তরুণরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বড় ঐতিহাসিক ঘটনার পর যেমন জনগণের নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, তেমনি এবারও হয়েছে। তবে ছাত্র-জনতা ঔপনিবেশিক শোষণমূলক ধারাবাহিকতা দেখতে চায় না। এই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য নতুন রাজনৈতিক দল প্রয়োজন ছিল, যা রক্তের বিনিময়ে গড়া নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে কাজ করবে। দলটি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে গঠিত হয়েছে।
এ সময় বড় একটি ঘটনা ছিল একদফার ঘোষক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ। ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকার ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ও অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সরকারের বাইরে রাজপথে তার ভূমিকা বেশি কার্যকর হবে।
এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে শহীদ মো. ইসমাইল হাসান রাব্বির বোন মিম আক্তার দলের নাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “গত ৫ আগস্ট দুই বোনের কাঁধে ভাইয়ের লাশ—আমি তাদের একজন।” সেদিন তিনি আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব হিসেবে আখতার হোসেনের নাম ঘোষণা করেন। ঘোষণাপত্রে উল্লেখ ছিল—দলটি ক্ষমতার জন্য নয়, বরং জনগণের ঐক্য, গণতান্ত্রিক সংস্কার, স্বচ্ছ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমনে কাজ করবে।
আত্মপ্রকাশের পর জাতীয় নাগরিক পার্টি নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে। শুরুতে ছিল জনগণের সীমাহীন প্রত্যাশা, কিন্তু সময়ের সাথে তা কমে যায়। অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, নেতাদের সমন্বয়হীনতা এবং কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দলটি ইমেজ সংকটে পড়ে। তবে জুলাই মাসে দেশব্যাপী “জুলাই পদযাত্রা”র মাধ্যমে তারা আবারও জনসমর্থন পায়। সর্বশেষ রবিবার তারা নতুন বাংলাদেশ গঠনে ২৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করে, যাতে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন সংবিধান প্রণয়ন, জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারসহ নানা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণায় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “শুধু এক ফ্যাসিবাদী শাসন সরিয়ে আরেক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সম্ভাবনা রেখে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি না। তাই তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল ও জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করেছি।


No comments