জুলাই আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা ছিল বিএনপির
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, একাত্তরের পর আমরা দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব শেখ হাসিনা ও তার পরিবার নিজেদের বলে দাবি করেছে। অথচ বাস্তবতা সবাই জানে—মুক্তিযুদ্ধে কে কী করেছে এবং কে সেই কৃতিত্বের ভাগ নিয়েছে, তা দেশের মানুষই বিচার করবে।
তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মূলনায়ক ছিলেন তারেক রহমান। ১ জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির সব অঙ্গসংগঠন সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। এ আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের ৯০ শতাংশই বিএনপির নেতাকর্মী। কিন্তু বিএনপি কখনোই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে বিভাজন চায়নি।”
শনিবার (২৬ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম শহরের জিইসি কনভেনশন হলে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে পেশাজীবীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
আমীর খসরু বলেন, “আমি নিজে আন্দোলনের সময় জেলে ছিলাম। তখন ভাবতাম, বাকি জীবন কীভাবে কাটাব। তখন প্রায় ১০ হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিল, যার মধ্যে ৯ হাজারই ছিল বিএনপির। তবে এসব বলার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়, বরং ইতিহাস সংরক্ষণ ও দলীয় কর্মীদের অনুপ্রাণিত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, আন্দোলনকে ১৮ কোটি মানুষের সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরতে। সেই কারণেই বিএনপি কখনোই কৃতিত্বের লড়াইয়ে নামেনি। তারেক রহমানও এ বিষয়ে কখনো দাবি করেননি।”
আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের আত্মত্যাগ স্মরণ করে তিনি বলেন, “অনেকে ব্যবসা হারিয়েছে, পরিবার ভেঙেছে, স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে গেছে। জেলে চিকিৎসার অনুমতি ছিল না। আমরা ভয় পেতাম, অসুস্থ হলে জেলেই মারা যেতে হবে।”
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের আলোচনা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নাম, যেমন ওয়াসিমের নাম পর্যন্ত বাদ পড়েছে। অথচ যাদের আত্মত্যাগে এ আন্দোলন শক্তিশালী হয়েছে, তাদের অনেকেই ভুলে যাওয়া হচ্ছে। শুধু নতুন বাংলাদেশ বললেই হবে না—আত্মত্যাগ ও ভূমিকার স্বীকৃতিও দিতে হবে।”
তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে আমীর খসরু বলেন, “তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে চান। মতভেদ থাকলেও সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। ৩১ দফার মাধ্যমে তারেক রহমান নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা দিয়েছেন, যেখানে তরুণদের জন্য বড় ভূমিকা থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “আগামী ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান কীভাবে সম্ভব, সে বিষয়ে আমরা পরিকল্পনা করেছি। বিএনপি নির্বাচিত হলে সবকিছু জনগণকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আহ্বায়ক জাহিদুল করিম কচি। প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হক।
আলোচনা সভায় ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, “ভুয়া মামলার মূল আমদানিকারক আওয়ামী লীগ। তারা স্বাধীনতার আগের কম্বলচোর শব্দকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। আজকের দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ও ‘অগ্নি টিকিট’ সংস্কৃতির জন্ম তারাই দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ আজ বিএনপির বিরুদ্ধে কথা বলছে, অথচ ’৯৬ সালে তারা নিজেরাই হরতালের নামে অরাজকতা করেছিল। ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। গায়ের জোরে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে জনগণই তাদের জবাব দেবে। বিএনপিই ঐক্যের ডাক দিয়েছে।”
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “বিএনপির ১৬ বছরের আন্দোলন শেখ হাসিনাকে পালাতে বাধ্য করেনি, কিন্তু তার দল এমন আন্দোলন করে না। ’৮৬ সালের ছাত্র-জনতা আন্দোলন এর প্রমাণ। আগামীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পাবে।”
তিনি আরও জানান, “ওয়াসিম আকরামের নামে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। আরও একটি পার্কও করা হবে তার নামে। তিনি মানুষের মনে থাকবেন চিরকাল।”
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আইনজীবী ফোরামের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট হাসান আলী চৌধুরী এবং মহানগর ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা. ইফতেখার ইসলাম লিটন। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন এবং আওয়ামী দুঃশাসনের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রও দেখানো হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন:
-
সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ডা. খুরশীদ জামিল চৌধুরী
-
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম নসরুল কাদির
-
অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (এ্যাব) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার জানে আলম সেলিম
-
সিএমইউজের সাবেক সভাপতি শামসুল হক হায়দরী
-
ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহকারী মহাসচিব মুস্তাফা নঈম
-
বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট এ এস এম বদরুল আনোয়ার
-
সিএমইউজের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান
-
জেলা ড্যাবের সাবেক সভাপতি ডা. আশরাফুল কবির ভূঁইয়া
-
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল সাত্তার
-
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিক আহমেদ
-
মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট মুফিজুল হক ভূঁইয়া
-
ড্যাব নেতা ডা. ঈসা চৌধুরী
-
ইঞ্জিনিয়ার মেজবাউল আলম
-
শিক্ষক নেতা আবদুল হক
-
ব্যাংকার মেহরাব হোসেন খান
-
ইঞ্জিনিয়ার মো. ওসমান
-
সিদ্দিক আল মামুন
সবশেষে বক্তারা বলেন, ইতিহাস বিকৃতি করে নয়, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনকল্যাণের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।


No comments