শিক্ষকের বর্ণনা: বিমান বিধ্বস্তের সেই দুঃসহ ৩ মিনিট
গত সোমবার দুপুরে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দোতলা ভবনে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার সময় দোতলার একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক মোহাম্মদ সায়েদুল আমীন আটকে পড়েন সাত-আটজন ছাত্রসহ। তিনি পরে বারান্দার একটি লোহার ফটক ভেঙে সবাইকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনেন। পরদিন ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় ঘটনার বিবরণ দেন তিনি নিজেই।
শিক্ষক জানান, “স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি দোতলায় শ্রেণিকক্ষে ছিলাম সাত-আটজন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রসহ। হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। প্রথমে মনে হয়েছিল বজ্রপাত, কিন্তু আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। কিছুক্ষণ পর দেখি পাশের নারকেলগাছে আগুন ধরে গেছে। ভাবার আগেই চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, ধোঁয়ায় দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা।"
তিনি বলেন, “আমার ক্লাসরুমটি ভবনের পশ্চিম পাশে, যার শেষে একটি ওয়াশরুম। কক্ষে থাকা দায় হয়ে পড়লে আমি প্রথমে বাচ্চাদের নিয়ে ওয়াশরুমে আশ্রয় নেই। এরপর হঠাৎ মনে পড়ল, বারান্দার একেবারে শেষ মাথায় একটা ছোট পকেট গেট আছে—যেটিতে সব সময় তালা দেওয়া থাকে। সেদিনও তালা ছিল। গেটের লোহার রডগুলো কিছুটা চিকন হওয়ায় ভাবলাম এটাকে ভাঙা সম্ভব হতে পারে।”
তিনি জানান, “জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষ চেষ্টা করছিলাম। বাচ্চারা আতঙ্কে কুঁকড়ে ছিল, কেউ কেউ ‘বাঁচান স্যার, বাঁচান’ বলে চিৎকার করছিল। তখন হঠাৎ দেখি, একটি ছেলে দৌড়ে আমার দিকে আসছে, তার শার্টে আগুন। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘স্যার, আমাকে বাঁচান।’ তাকে ধরতেই আমার হাতও পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। তখন দ্রুত তাকে ওয়াশরুমে থাকা অন্য ছাত্রদের পানি ঢালতে বলি। নিজে গেট ভাঙতে থাকি।”
তিনি আরও বলেন, “গেট ভাঙতে গিয়ে কতক্ষণ, কত জোরে লাথি মেরেছি, তা আর মনে নেই। শুধু ভাবছিলাম, এখনই ভাঙতে না পারলে শেষ হয়ে যাব আমরা সবাই। একসময় গেটের কিছু রড ভেঙে ও বাঁকিয়ে একটি শরীর ঢোকার মতো ফাঁকা তৈরি হয়। গেটের পাশেই একটি আমগাছ ছিল, সেটি ধরে দু-একজন নিচে নামে। পরে বাইরে থাকা লোকজন ওই গাছে উঠে সবাইকে নামিয়ে আনে। এই পুরো ঘটনাটা সম্ভবত তিন মিনিটের মধ্যে ঘটে, কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল কেটে যাচ্ছে।”
নিচে নামার পর তিনি প্রথম বুঝতে পারেন যে একটি বিমান ভবনে বিধ্বস্ত হয়েছে। এর আগে বিমান দুর্ঘটনার কথা তাঁর মাথাতেই আসেনি। তিনি বলেন, “বিমানের সাধারণ ইঞ্জিন শব্দ তো শুনিনি। বরং দুটি বিকট শব্দ—একটি আছড়ে পড়ার সময়, আরেকটি সম্ভবত জ্বালানির বিস্ফোরণের।”
তিনি বলেন, “আমার চোখের সামনে সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীরা পুড়ে মারা গেছে। অনেকেই হাসপাতালের শয্যায়। সহকর্মী শিক্ষক মারা গেছেন, কেউ কেউ জীবন নিয়ে যুদ্ধ করছেন। এটা এক বিভীষিকা। এমন দিন দেখব, কোনো দিন ভাবিনি। যে ফুলগুলো ঝরে গেছে, তারা আর ফিরবে না। যারা বেঁচে আছে, তাদের যেন সৃষ্টিকর্তা সুস্থ করে তোলেন—এই প্রার্থনাই করছি।”
তিনি জানান, স্কুল ভবনের নিচতলায় বাংলা মাধ্যম এবং দ্বিতীয় তলায় ইংরেজি মাধ্যমের ক্লাস হয়। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় তলায়। সেখানে ১২টি কক্ষ, সিঁড়ির দুই পাশে মেয়েদের ও ছেলেদের শ্রেণিকক্ষ। বিমানের আঘাত ছিল নিচতলার সিঁড়ির কাছাকাছি, যা থেকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “আমার সঙ্গে থাকা ছেলেগুলো সবাই নিরাপদে বের হতে পেরেছে। তবে ধোঁয়া ও তাপের কারণে কেউ কেউ কিছুটা আহত হয়েছে। শুনেছি, সেই গায়ে আগুন নিয়ে দৌড়ে আসা ছেলেটিও বেঁচে আছে এবং হাসপাতালে ভর্তি আছে।”
শেষে তিনি বলেন, “আর এক–দু’মিনিট দেরি হলে হয়তো কেউ বাঁচতাম না। ভয়ংকর তাপমাত্রা, ধোঁয়া, আর পেছনে ছুটে আসা আগুন—এসব একসঙ্গে এমন এক বিভীষিকা তৈরি করেছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।


No comments