Header Ads

মৃত্যুর মিছিল কোথায় গিয়ে থামলে বদলাবে চিত্র?

                              

                       

মৃত্যুর মিছিল কোথায় গিয়ে থামলে বদলাবে চিত্র?




স্কুলে ইংরেজি শেখার সময় একটা লাইন খুব প্রচলিত ছিল: “রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার আসিল।” আরেকটি ছিল, “ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগীটি মারা গেল।” এই লাইন দুটি যেন এখনকার বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। দেশে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি ঘটনায় অকালে হারিয়ে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। কিছুদিন এসব নিয়ে সরগরম থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টিভি স্ক্রিন, আর চায়ের দোকান। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয় কিছু পদক্ষেপ।

এরপর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। সেই কমিটি প্রতিবেদন দেয়। জানা যায়, কোথাও গাফিলতি ছিল, কোথাও নিরাপত্তার ঘাটতি। অথচ যদি আগে থেকেই এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো, তাহলে হয়তো প্রাণহানি ঠেকানো যেত। কিন্তু দুর্ঘটনা না ঘটলে আমরা অনেক কিছু জানিই না। আমরা অপেক্ষা করি একটা দুর্ঘটনার, তারপর সত্য উন্মোচন করি।

প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর কিছুদিন তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু পরে আবার সব নিস্তব্ধ। যেন আমরা পরবর্তী মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকি।

ঢাকা শহর এখন যেন এক মৃত্যুপুরী। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। এক পরিকল্পনাহীন নগরীতে টিকে থাকতে আমাদের লড়তে হয় প্রতিনিয়ত। ধারণক্ষমতার বহু গুণ বেশি জনসংখ্যা ও স্থাপনা নিয়ে চলতে থাকা এই শহরে প্রশ্ন ওঠে: আর কত প্রাণ গেলে আমরা সচেতন হব?

চলুন, কয়েকটি আলোচিত দুর্ঘটনার দিকে নজর দিই—


চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি (২০১৯)

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন নিহত হন। ওয়াহেদ ম্যানশনে রাখা অবৈধ কেমিক্যালের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ রূপ নেয়। আগুনে পুড়ে যায় বহু যানবাহন।

পরে জানা যায়, পুরান ঢাকায় ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র আড়াই হাজার বৈধ। অথচ এই তথ্য জানার জন্য প্রয়োজন হলো একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার। ২০১০ সালের নিমতলীতেও একইভাবে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপরও বদলায়নি কিছুই।


বনানীর এফআর টাওয়ার (২০১৯)

২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনে ২৬ জন নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন। তদন্তে উঠে আসে, নকশায় অনিয়ম ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। ভবনের অনুমোদিত নকশা জালিয়াতির প্রমাণও মেলে। তবুও এসব অনিয়ম আগেই ধরা পড়েনি, কারণ আমরা ব্যবস্থা নেই ঘটনার আগে— নিই পরে।


ইউনাইটেড হাসপাতাল (২০২০)

২০২০ সালে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুনে ৫ জনের মৃত্যু হয়। তদন্তে বলা হয়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র থেকেই আগুনের সূত্রপাত এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। ফায়ার সার্ভিস বলেছিল, "তারা আরও সতর্ক হতে পারত।"

এই “সতর্ক হওয়া উচিত ছিল” কথাটা এখন এক ঘুরে ফিরে আসা ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।


মগবাজার বিস্ফোরণ (২০২১)

২৭ জুন, ২০২১ সালে মগবাজারে গ্যাস লাইনের ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণে ১২ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন। বিস্ফোরণে আশপাশের ভবন ও যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রশ্ন হলো, এই ত্রুটিপূর্ণ লাইন আগে কেন ধরা পড়েনি? দায় কার— সাধারণ মানুষের, না কর্তৃপক্ষের?


বঙ্গবাজার ট্র্যাজেডি (২০২৩)

২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল বঙ্গবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৩০৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয় এবং ৩,৮৪৫ জন ব্যবসায়ী সর্বস্ব হারান। তদন্তে উঠে আসে, একটি টেইলার্সের মশার কয়েল বা বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত। এত বড় একটি মার্কেটে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না— এটি কি নজরদারি কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা নয়?


বেইলি রোড ট্র্যাজেডি (২০২৪)

১ মার্চ ২০২৪, ঢাকার বেইলি রোডে একটি বহুতল ভবনে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন লেগে ৪৬ জন নিহত হন। ভবনের অনুমোদনহীন সম্প্রসারণ এবং দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ। অথচ আগুন না লাগলে এসব অনিয়ম ধরা পড়ত না।


মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২০২৫)

সর্বশেষ ট্র্যাজেডি ঘটে রাজধানীর উত্তরায়, যেখানে একটি যুদ্ধবিমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিধ্বস্ত হয়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ২৫ জনই শিশু। আহত অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ভবিষ্যতে তদন্ত প্রতিবেদন আসবে, পরিবারগুলো কিছু ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু এতগুলো প্রাণের ক্ষতি কি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব?


কেন এসব ঘটে বারবার?

২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা এবং ২০০৩ সালের অগ্নি নির্বাপন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম মানা হয় না। বেশিরভাগ ভবনই নির্মিত হয় নিয়মবহির্ভূতভাবে। বাণিজ্যিক স্বার্থে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করা হয়, যার মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু তাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। শুধু কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা নয়, আমাদের সামাজিক উদাসীনতাও দায়ী। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবহার জানা, সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।


করণীয়

  • সচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল-কলেজে অগ্নি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

  • নিয়মের বাস্তবায়ন: রাজউক, ফায়ার সার্ভিসকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

  • নির্মাণে কঠোরতা: অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়া কোনো ভবনের অনুমোদন দেওয়া যাবে না।

  • নগর পরিকল্পনা: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত নগরায়ণ এখন সময়ের দাবি।


আর কত প্রাণ গেলে আমরা শিখব? মৃত্যু নয়, সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপই হতে পারে আমাদের একমাত্র পথ।

No comments

Powered by Blogger.