জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর, আহতরা কি পাচ্ছে সঠিক চিকিৎসা?
গত বছরের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে বাঁ ঊরুর হাড় ভেঙে যায় গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক শামীম মিয়ার। এরপর থেকে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ছয়টি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাঁকে। বর্তমানে তিনি ভর্তি আছেন ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল)। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
গত বছরের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথে ছিলেন শামীম। সেই সময় পুলিশের গুলিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বহু মানুষ আহত হন। সরকারি হিসাবে আহতের সংখ্যা ১৩ হাজার ৮১১, আর ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ বলা হয়েছে, আহত ১২ হাজার ৮৮৭ জন।
শামীমের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলে। গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন, মাসে বেতন পেতেন ২৫ হাজার টাকা। স্ত্রীও কাজ করতেন অন্য একটি কারখানায়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে স্ত্রী রাজিয়া তাঁর সেবায় থাকায় চাকরি ছাড়তে হয়। এখন তাঁরা লাখ টাকার বেশি ঋণের বোঝা বয়ে চলেছেন, যদিও ফাউন্ডেশন ও সরকার মিলে তিন লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে।
৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শামীমকে একাধিক হাসপাতালে নিতে হয়। মাঝে পড়ে যান দালালের খপ্পরে, ভর্তি হন শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। এরপর বিভিন্ন সময় ময়মনসিংহ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সিএমএইচ ও শেষ পর্যন্ত পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। অস্ত্রোপচারের পর হাড়ে সংক্রমণ দেখা দেয়, এখনো তাঁর পায়ে উন্নতি হয়নি।
চিকিৎসকেরা জানান, বারবার সংক্রমণ, দেরিতে ও ভুল চিকিৎসার কারণে শামীমের অবস্থা জটিল হয়েছে। তাঁর ঊরুর ছয় ইঞ্চি হাড় কেটে ফেলতে হয়েছে।
সঠিক চিকিৎসার অভাবে আরও অনেকের পরিস্থিতি জটিল
প্রথম আলোর তথ্যানুসারে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত তিনটি বড় কারণে যথাযথ চিকিৎসা হয়নি:
-
পুলিশি হয়রানির ভয়ে অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হননি বা প্রাথমিক চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরে যান।
-
ব্যয় বহনের সমস্যা ও দুশ্চিন্তায় চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে হয়েছে অনেককে।
-
অনেক বেসরকারি হাসপাতাল তখন আহতদের ভর্তি করাতে চায়নি।
পঙ্গু হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আবুল কেনান জানান, অনেক হাসপাতালে আহতদের ভর্তি না করানোর জন্য চাপ ছিল।
ছররা গুলিতে চোখ হারানো মানুষের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে
ছররা গুলির কারণে চোখে আঘাত পেয়েছেন ১,০৮৭ জন। এর মধ্যে ৪৫০ জন এক চোখে, ২০ জন দুই চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। অনেককে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সাতজন চিকিৎসার জন্য তুরস্কে আছেন।
সরকারী হিসাবে আহতদের শ্রেণিবিভাগ
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী:
-
অতি গুরুতর আহত: ৪৯৩ জন (অঙ্গহানি, অক্ষমতা)
-
গুরুতর আহত: ৯০৮ জন (মস্তিষ্ক, আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারানো)
-
আহত: ১০,৬৪২ জন (গুলি, লাঠিপেটা, আগুনে পোড়া ইত্যাদি)
আহতদের এখনো অনেকে চিকিৎসাধীন
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখনো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৩৮ জন চিকিৎসাধীন। তবে অনেক হাসপাতালে এ সংখ্যা বাস্তবে কম। যেমন, চক্ষু হাসপাতালে এখন কেউ ভর্তি নেই, যদিও সরকার বলছে ১১৬ জন। পঙ্গু হাসপাতালে আছে ১০ জন, যদিও তথ্য বলছে ১২১ জন।
ঢাকা সিএমএইচে এখনো ২২ জন চিকিৎসাধীন। এ পর্যন্ত ৭৫ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে সিঙ্গাপুরে ১১, থাইল্যান্ডে ৫৬, তুরস্কে ৭ এবং রাশিয়ায় ১ জন। এখনও থাইল্যান্ডে ৩৯ জন ও তুরস্কে ৭ জন চিকিৎসাধীন।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ঘাটতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, আহতদের মানসিক স্বাস্থ্য, ফিজিওথেরাপি ও ভবিষ্যৎ জীবিকার জন্য কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই হতাশায় ভুগছেন।
আহতদের একাংশ চিকিৎসা অব্যবস্থাপনা নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন একাধিকবার। প্রধান উপদেষ্টার বাসার সামনে, সচিবালয় ও বিভিন্ন হাসপাতালে অবস্থান ও বিক্ষোভ করেছেন তাঁরা।
সরকারি তথ্যমতে, বিদেশে চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত ৭৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আরও অনেককে বিদেশে পাঠানোর জন্য পাসপোর্ট ও ভিসার প্রক্রিয়া চলছে।
.jpg)

No comments